
পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জনবান্ধব করতে পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ লক্ষ্যে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ চূড়ান্ত করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে এতে থাকা আইজিপি (মহাপরিদর্শক) নিয়োগসংক্রান্ত ধারা সরকারি চাকরি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে মনে করছেন প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, আইজিপি নিয়োগের পর থেকে দুই বছর পর্যন্ত দায়িত্বে থাকতে পারবেন, বয়স যতই হোক না কেন। কিন্তু সরকারি চাকরি আইনের ৪৩ ধারা অনুযায়ী অবসরের বয়সসীমা ৫৯ বছর (মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে ৬০)। ফলে নতুন বিধানটি ওই আইনের পরিপন্থি হবে।
প্রশাসন বিশ্লেষক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, “পুলিশ সরকারি চাকরি আইনের অধীন। তাই ৫৯ বছরের বেশি চাকরির সুযোগ দেওয়া অনুচিত। এতে ভবিষ্যতে অন্যান্য সচিব বা সংস্থা প্রধানরাও একই সুবিধা দাবি করতে পারেন, যা প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।”
অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, কমিশনের চেয়ারপারসন ও শীর্ষ তিনটি পদে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে পুলিশের কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ বিচার বিভাগের হাতে চলে যাবে বলে কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই কমিশনে দক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন।
খসড়া অনুযায়ী, কেউ যদি অবসরের অল্প আগে আইজিপি হন, তবে তিনি ৬১ বছর বয়স পর্যন্ত দায়িত্বে থাকতে পারবেন, যা অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা সৃষ্টি করবে। আবার তুলনামূলক তরুণ কেউ আইজিপি হলে মাত্র দুই বছর পর অবসরে যেতে হবে—ফলে উভয় ক্ষেত্রেই বৈষম্য তৈরি হবে।
গত ৬ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় অধ্যাদেশের বেশ কিছু ধারার বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়। বৈঠকে কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশকে স্বাধীন করা ভালো উদ্যোগ হলেও কমিশন গঠনের পর পুলিশ যেন সরকারের দিকনির্দেশনা উপেক্ষা না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “কমিশনের নেতৃত্বে বিচারকদের বসানো হলে পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তারা আস্থাহীনতায় ভুগবেন। প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের অভিজ্ঞদের নিয়োগই এখানে যুক্তিসঙ্গত।”
কমিশন গঠনের কাঠামো অনুযায়ী, আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক কমিশনের চেয়ারপারসন হবেন। সদস্য হিসেবে থাকবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ, একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা (গ্রেড-২ পদমর্যাদার নিচে নন), একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি, একজন পুলিশ একাডেমির সাবেক অধ্যক্ষ, আইন বা অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ে একজন অধ্যাপক এবং অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মানবাধিকারকর্মী। সদস্যদের মধ্যে অন্তত দুইজন নারী থাকতে হবে।
প্রতিটি বিভাগে তিন সদস্যবিশিষ্ট ‘পুলিশ জবাবদিহিতা ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও আছে, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন জেলা জজ। এ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেসামরিক কর্মকর্তারা। তাদের মতে, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে বিচার বিভাগের পরিবর্তে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শিগগিরই অধ্যাদেশের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধনের প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে বলে জানা গেছে।
সিএনআই/২৫