৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার
২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি: সংকট ও সম্ভাবনার লড়াই

শেয়ার করুন

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য বর্তমান বাস্তবতা। উপকূলীয় জনপদে লবণাক্ততার বিস্তার, উত্তরাঞ্চলে খরা, বর্ষাকালে আকস্মিক বন্যা এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত দেশের লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একবার বলেছিলেন, “Climate change is the defining issue of our time.” বাংলাদেশের বাস্তবতা সেই বক্তব্যেরই প্রতিফলন। জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সূচক দেখায়, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশ। সাম্প্রতিক Climate Risk Index-এও বাংলাদেশের অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যেই রয়েছে। দেশটি বিশেষভাবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ এবং নদীভাঙনের মতো দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে।

চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় যখন দেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার দিকে তাকানো হয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ৩২ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এই অঞ্চলগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে প্রায় ৩ কোটি মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ৩ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বসবাস করছে, যা দুর্যোগের মাত্রাকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ এত বেশি ঝুঁকিতে কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি আন্তঃসম্পর্কিত কারণ। প্রথমত, দেশের নিম্নভূমি ও বদ্বীপীয় ভূপ্রকৃতি। দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত উচ্চ জনঘনত্ব। তৃতীয়ত, কৃষি ও মৎস্যনির্ভর অর্থনীতি, যা আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে জলবায়ুর সামান্য পরিবর্তনও খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। উপকূলীয় এলাকায় কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন কমছে। নদীভাঙনে প্রতিবছর বহু পরিবার বসতভিটা হারাচ্ছে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে দেশের জিডিপির প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কার কথা বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক এক বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে শুধু ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে এবং ২ কোটি ৫০ লাখ কর্মদিবস হারিয়ে গেছে।

তবে চিত্রের অন্য দিকও রয়েছে। গত কয়েক দশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, উপকূলীয় বাঁধ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটি অংশগ্রহণের কারণে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। Germanwatch-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ফলে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়জনিত মৃত্যুর হার অতীতের তুলনায় নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের নতুন সুযোগও সামনে আসছে। লবণাক্ততা ও বন্যা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ অভিযোজন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

তবে পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমাধান সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদরা জোর দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর। অন্যদিকে উপকূলের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপদ বাসস্থান, বিকল্প জীবিকা এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত সহায়তা।

সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের জলবায়ু সংকট কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি উন্নয়ন, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি অভিযোজনের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লড়াই শুধু একটি দেশের সংগ্রাম নয়; এটি বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়নেরও পরীক্ষা।

ইয়াসির হামিদ
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

শেয়ার করুন