৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার
২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুপার এল নিনো ২০২৬: বাংলাদেশের জন্য কতটা উদ্বেগের?

শেয়ার করুন

 

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক রহিম মিয়ার চোখে এখন দুশ্চিন্তার ভাজ। জুন মাসের তপ্ত দুপুরে আকাশপানে চেয়ে মেঘ খুঁজছেন তিনি। বরেন্দ্র অঞ্চলের এই খরতপ্ত মাটিতে আমন ধান রোপণের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির দেখা নেই। রহিম মিয়ার ভাষায়, “আগে এই সময়ে আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি নামত, মাঠ ভিজে যেত। এখন শুধু কড়া রোদ আর বাতাস। মাটির রস সব শুকিয়ে পাথর হয়ে যাচ্ছে।” রহিম মিয়ার এই ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাস কেবল একজন কৃষকের একার নয়; এটি মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে গড়ে ওঠা এক দানবীয় আবহাওয়া পরিস্থিতির আগাম সঙ্কেত। যাকে বিজ্ঞানীরা ‘সুপার এল নিনো’ নামে অভিহিত করছেন। প্রশান্ত মহাসাগরের সেই উষ্ণ স্রোত কীভাবে বাংলাদেশের উত্তরের রহিম মিয়া বা দক্ষিণের উপকূলীয় জেলেদের জীবন তছনছ করে দিতে পারে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে আলোচনা।

এল নিনো: যখন মহাসাগর হয়ে ওঠে দানবীয় হিটার

এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ফিরে আসে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন (ENSO) চক্রের একটি পর্যায়। সাধারণ অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পশ্চিমা বায়ু উষ্ণ জলরাশিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনো পর্যায়ে এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মধ্য মহাসাগর থেকে উষ্ণ জলরাশি উল্টো দিকে অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। প্রশান্ত মহাসাগরের এই বিশাল জলরাশি তখন একটি দানবীয় হিটারের মতো কাজ করে। অর্থাৎ এটি পুরো বিশ্বের বায়ুমণ্ডলের ওপর প্রভাব ফেলে এবং আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

সাধারণ এল নিনোর চেয়ে ‘সুপার এল নিনো’ অনেক বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক। যখন প্রশান্ত মহাসাগরের নিিনো ৩.৪ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পায় তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। ২০২৬ সালের সম্ভাব্য এল নিনোর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন। একে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ইভেন্টে পরিণত করতে পারে।

অতীতের ক্ষত: সুপার এল নিনোর ইতিহাস

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সুপার এল নিনো সব সময়ই বিশ্বের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ১৯৮২-৮৩ সালের এল নিনোর প্রভাবে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায় চরম খরা দেখা দেয় এবং বিশ্ব অর্থনীতি শতকোটি ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোকে বলা হয় গত শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী আবহাওয়া ঘটনা, যার প্রভাবে বাংলাদেশেও কৃষিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। আর ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনোর ফলে সৃষ্ট খরার কারণে ভারতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৮৭৬-৭৮ সালের এল নিনো, যার ফলে এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ৫ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিল। বর্তমানে ২০২৬ সালের পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক। কারণ দেড়শ বছর আগের তুলনায় পৃথিবী এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উত্তপ্ত।

২০২৬ সালের পূর্বাভাস: অশনি সঙ্কেত

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং নাসার (NASA) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ২০২৬ সালকে ঘিরে উচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের মে-জুলাই মাসের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ এবং বছরের শেষ ভাগে এর শক্তি সঞ্চয়ের আশঙ্কা ৯০ শতাংশের ওপরে। নাসার সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেইলিখ স্যাটেলাইটের তথ্যানুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে ইতোমধ্যে শত শত মাইল জুড়ে উষ্ণ জলরাশি আমেরিকা উপকূলের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, উষ্ণ বিশ্বের আগুনে এল নিনো আরও তেল ঢালবে।

বিশ্ব মানচিত্রে বিপর্যয়ের ছায়া

২০২৬ সালের এই সুপার এল নিনোর প্রভাব হবে বৈশ্বিক। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়বে এবং বৃষ্টিপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ায় ইতোমধ্যে খরার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ফলে এটি সে দেশগুলোতে ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানল ও খরার আশঙ্কা করা হচ্ছে, অন্যদিকে আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকায় দেখা দিতে পারে অস্বাভাবিক অতিবৃষ্টি ও বিধ্বংসী বন্যা। আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা থাকলেও দক্ষিণ আফ্রিকায় চরম খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে। ইউরোপেও তীব্র দাবদাহের মাধ্যমে আবহাওয়া তার চরম রূপ দেখাতে পারে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: তপ্ত নিঃশ্বাস ও অস্থির প্রকৃতি

বাংলাদেশের জন্য সুপার এল নিনো ২০২৬ টিকে থাকার লড়াই। এর প্রভাবগুলো নিচ আলোচনা করা হলো:

তাপপ্রবাহের তণ্ডব: সুপার এল নিনোর প্রভাবে দেশে তাপপ্রবাহের সময় এবং তীব্রতা অনেক বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ইতোমধ্যে দেশের ৪৮টি জেলায় মৃদু থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তাপমাত্রা ৪০-৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগে যেখানে বছরে দুই-তিনটি তাপপ্রবাহ হতো, এল নিনোর প্রভাবে তা এখন পাঁচ-ছয়বার বা তারও বেশি হতে পারে।

বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা ও খরা: এল নিনো সক্রিয় থাকলে বর্ষাকালে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশে তীব্র খরা দেখা দিতে পারে। ফলে এটি নদীর পানি প্রবাহ কমিয়ে দেবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে আরও নিচে নামিয়ে দেবে।

উপকূলীয় ঝুঁকি ও লবণাক্ততা: বৃষ্টির অভাব এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সুপেয় পানির সংকট আরও তীব্র হবে এবং চিংড়ি ঘেরসহ মৎস্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমুদ্রের পানি উষ্ণ হওয়ার কারণে বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: বাংলাদেশের প্রধান শস্য আমন ও আউশ চাষ বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টির অভাবে আমন রোপণ ব্যাহত হবে এবং তীব্র রোদে ধান ও সবজি পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়বে, যা চাষের খরচ বাড়িয়ে দেবে। ভারত ইতোমধ্যে চাল রপ্তানিতে বিধিনিষেধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের চালের বাজারে অস্থিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি তৈরি করবে।

জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি: অতিরিক্ত গরমে ডায়রিয়া, কলেরা এবং মশা বাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের কাজের সক্ষমতা কমে যাবে এবং এটি সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা চরমে পৌঁছাবে, ফলে লোডশেডিংয়ের সমস্যা জনজীবনকে আরও বিষিয়ে তুলতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর মরণোত্তর যুগলবন্দী

জলবায়ু পরিবর্তন সুপার এল নিনোর প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী এখন এমনিতেই ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ২০২৪ সাল ছিল রেকর্ড উত্তপ্ত বছর। এই তপ্ত পৃথিবীর ওপর যখন সুপার এল নিনো ভর করে তখন আবহাওয়া চরম থেকে চরমতর হয়। গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে যে অতিরিক্ত শক্তি জমা হয়েছে তা এল নিনোকে আরও বিধ্বংসী হওয়ার জ্বালানি সরবরাহ করে।

বিশেষজ্ঞদের মত ও করণীয়

বাংলাদেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সাল আমাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও কৃষি গবেষকরা কৃষকদের জন্য খরা-সহনশীল ধানের জাত এবং স্বল্প মেয়াদি ফসল চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে এবং দুর্যোগকালীন খাদ্য মজুদ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও অভিযোজন কৌশল

১. আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা: আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া যাতে কৃষকরা ফসলের সময়সূচি ঠিক করতে পারেন।

২. পানি ব্যবস্থাপনা: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং পুকুর ও খাল খননের মাধ্যমে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো।

৩. খরা-সহনশীল ফসল: ব্রি-৫৬ বা ব্রি-৭১ এর মতো খরা-সহনশীল জাতের ধানের বিস্তার ঘটানো এবং ধান ও সবজি চাষে ড্রিপ ইরিগেশন বা তুঁত সেচ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো।

৪. নগর পরিকল্পনা: শহরের তাপমাত্রা কমাতে হিট অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণ করা, কৃত্রিম জলাধার তৈরি এবং প্রচুর গাছ লাগানো।

৫. জনসচেতনতা: তাপপ্রবাহের সময় হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং লবণাক্ততা মোকাবেলায় উপকূলীয় মানুষকে সচেতন করা।

প্রকৃতির রুদ্ররূপ বনাম মানবিক সংহতি

সুপার এল নিনো ২০২৬ কেবল একটি বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়; এটি রাজশাহীর রহিম মিয়ার কান্না, সাতক্ষীরার জেলের লবণাক্ত জীবন আর তপ্ত রোদে পুড়ে চলা শ্রমিকের ঘাম। এটি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মানুষের অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকৃতিকে কতটা অস্থির করে তুলেছে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষ তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা আর সংহতি দিয়ে বারবার দুর্যোগ জয় করেছে। ২০২৬ সালের এই আসন্ন সংকট মোকাবেলায় আমাদের এখন থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা আর মানবিক সহমর্মিতা নিয়ে একজোট হতে হবে। যদি আমরা সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারি, তবে হয়তো রহিম মিয়ার মাঠ আবার সবুজে ভরে উঠবে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা আমাদের জীবনের প্রদীপ নেভাতে পারবে না। সুপার এল নিনো আমাদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শেষ সুযোগ।

রাকিবুল হাসান মুন্না

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

শেয়ার করুন