
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার মতো কোনো ঘটনা চোখে পড়েনি। নির্বাচনের আগে জনমনে ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তা থাকলেও ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক এবং সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিল। যদিও কেন্দ্র নির্বাচনে অব্যবস্থাপনা এবং প্রিজাইডিং অফিসারদের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তবুও সামগ্রিকভাবে নির্বাচনে কোনো বড় ধরনের অনিয়ম বা কারচুপি লক্ষ করা যায়নি।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: পর্যবেক্ষকদের তাৎক্ষণিক রিপোর্ট ও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ’ অনুষ্ঠানে এসব মন্তব্য করেছে নির্বাচনের পর্যবেক্ষক সংস্থা ইলেকশন অবজার্ভার সোসাইটি (ইওএস)।
এসময় উপস্থিত ছিলেন সোসাইটির সভাপতি ইকবাল হোসেন হীরা, সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ, প্রধান সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম আপ্পি, সহ-সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ ও নির্বাহী মাহমুদা পারভীন প্রমুখ।
সংস্থাটি জানায়, সারাদেশে ২৯৯টি আসনে ৩৮,২৯৯টি ভোটকেন্দ্রে সংস্থাটির ৩৬ হাজার পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। এরমধ্যে মসজিদের ইমাম, নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ছিল।
ইলেকশন অবজার্ভার সোসাইটির মতে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া গেলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা সময় লেগেছে। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে কিছু অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করেছিল। তবে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকে ঘিরে একাধিক ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। যদিও কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। দাবির মুখে পরে কয়েকটি সিদ্ধান্ত সংশোধন বা প্রত্যাহার করা হয়- যেমন প্রতীকের অবস্থান পরিবর্তন, শাপলা প্রতীক অন্তর্ভুক্তির সময়কাল, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিধিনিষেধ।
সংস্থাটি জানায়, ঋণখেলাপি ইস্যুসহ কিছু বিষয়ে কমিশন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে, যা ইসির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যম কর্মীদের পরিচয়পত্র অনলাইন-অফলাইন সিদ্ধান্তহীনতায় উভয়ের ভোগান্তি বাড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, কিছু কেন্দ্রে বুথ স্থাপন সংক্রান্ত অসামঞ্জস্য দেখা গেছে, যেমন নিচতলা ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও উপরের তলায় বুথ স্থাপন করা হয়েছিল, যা বয়স্ক ও অসুস্থ ভোটারদের জন্য কষ্টসাধ্য ছিল। একই সঙ্গে সব কেন্দ্রে ভোটারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি বলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতীয়মান হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল, যা ভবিষ্যতে বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রচারণা সংক্রান্ত ব্যয় ও পরবর্তীতে কমিশনের শেষ মুহূর্তে নিষেধাজ্ঞা প্রদান জনমনে কিছু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
সোসাইটির সভাপতি ইকবাল হোসেন হীরা বলেন, কিছু শক্তিশালী প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রবণতা এবং পারস্পরিক ব্যক্তিগত আক্রমণের বিচ্ছিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষকদের নজরে আসে, যা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। নির্বাচনের আগের রাত পর্যন্ত গুজব ছড়ানো এবং কিছু স্থানে ভোট প্রভাবিত করার অপচেষ্টা দেখা গেলেও সেগুলো সফল হয়নি এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক ও নিয়ন্ত্রিত। দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাদারিত্ব, সক্রিয়তা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী নির্বাচনি সময়জুড়ে দৃঢ় ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিছু ছোটখাটো অনাকাঙিক্ষত বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সামগ্রিক পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল ও নিরাপদ। টানটান উত্তেজনার মধ্যেও কোনো প্রাণহানি ছাড়া নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইকবাল হোসেন হীরা বলেন, পর্যবেক্ষকদের মতে, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও কোনো আসনে ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে এমন গুরুতর অনিয়ম বা অসঙ্গতি চোখে পড়েনি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আলোচনাতেও একই ধরনের মূল্যায়ন উঠে এসেছে। নারী ও তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততার ইতিবাচক প্রতিফলন। সার্বিকভাবে নির্বাচনে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে বলে পর্যবেক্ষকদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়েছে।