
নতুন সরকারের আয়োজনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শুরু হচ্ছে আগামীকাল রোববার (৩ মে)। সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদের পাঠানো প্রস্তাব থেকে ৪৯৮টি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এগুলোর মধ্যে বড় তিন প্রস্তাব এসেছে গাজীপুর, রংপুর ও নোয়াখালীর ডিসির কাছ থেকে।
গাজীপুর জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপন করে শিল্পকারখানাসমূহকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থানান্তর করার প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসি। নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দর স্থাপনের প্রস্তাব এসেছে। আর রংপুর বিভাগে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালের প্রস্তাব দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার।
এদিকে ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে শনিবার প্রেস ব্রিফিং করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ( মাঠ প্রশাসন সমন্বয় ) মো. হুমায়ুন কবির জানান, এবারের সম্মেলন ৩ থেকে ৬ মে পর্যন্ত চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত সম্মেলন ছিল তিন দিনব্যাপী।
সম্মেলনের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলো হলো- ভূমি ব্যবস্থাপনা; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম জোরদার করা; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম; স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন; সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ই-গভর্ন্যান্স; শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সম্প্রসারণ; স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ; পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ; ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়।
সম্মেলন চলাকালে কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। তারা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা গ্রহণ ও মতবিনিময় করবেন।
তিনি বলেন, এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারবৃন্দ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সাথে কার্য-অধিবেশন রয়েছে।
হুমায়ুন কবির জানান, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মোট ৩৪টি অধিবেশন ও কার্য-অধিবেশন হবে। এর মধ্যে কার্য-অধিবেশন ৩০টি; উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও সদয় নির্দেশনা গ্রহণসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা ৩টি এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনা ও বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভা ১টি।
অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৯৮টি প্রস্তাব কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব প্রস্তাবে জনসেবা ও স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি, জনদুর্ভোগ কমানো, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ নির্মাণ, পর্যটনের বিকাশ, আইন-কানুন বা বিধিমালা সংশোধন এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৪৪টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, ৩ মে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নির্দেশনা গ্রহণ, ৪ মে জাতীয় সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নির্দেশনা গ্রহণ এবং ৫ মে সুপ্রিম কোর্ট ভবনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নির্দেশনা গ্রহণের সূচি রয়েছে।
সম্মেলনের প্রত্যাশিত ফলাফলের বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব বলেন, মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে জেলা প্রশাসকরা যে আইনগত, প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন এবং স্ব স্ব জেলায় বিদ্যমান সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করেন—এসব বিষয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী, সিনিয়র সচিব ও সচিবদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর পন্থা নির্ধারণ এবং সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর কৌশল প্রণয়ন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, এছাড়া মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোর অনুসৃত নীতি-কৌশল, গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জেলা প্রশাসকরা সম্যক ধারণা লাভ করবেন। একই সঙ্গে পর্যটন খাতের বিকাশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর বৃদ্ধি, সরকারের নীতি ও কর্মসূচির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিসিদের দেওয়া ৫০টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলোতে জনসেবা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি, জনদুর্ভোগ কমানো, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ নির্মাণ, পর্যটনের বিকাশ, আইন-কানুন বা বিধিমালা সংশোধন, জনস্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৪৪টি প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সংক্রান্ত বলে জানান অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাব
ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহ পুনর্নির্মাণ/মেরামত, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তাব এসেছে। রংপুর বিভাগে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার। নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসি। নোয়াখালী মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিমান বন্দর নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। আশা করা হচ্ছে বর্তমান সরকারের সময়ে নোয়াখালীবাসীর এ দাবি পূরণ হতে পারে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রস্তাব মিলেছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসা বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত পরিশোধনাগার নির্মাণের প্রস্তাবও উঠেছে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রসমূহে মিডওয়াইফারি পদ সৃষ্টি ও পদায়ন।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (আইসিটি), সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম) এবং সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার বিজ্ঞান/গ্রন্থাগারিক) পদে নিয়োগ প্রদান। বাংলাদেশের সব দরিদ্র প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক ঘোষণা করা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি ডোমেইন ব্যবহার করে ওয়েবসাইট তৈরি। কওমি মাদরাসা স্থাপনের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং মাদ্রাসাসমূহকে ওই নীতিমালার আওতায় আনা। সিলেট বিভাগের সব চা-বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং বিদ্যমান নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ জাতীয়করণ।
সব শিশুর শেখার চাহিদা বিবেচনায় একীভূত (ইনক্লুসিভ) কারিকুলাম, সময়সূচি ও মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন। দেওয়ানি আদালত ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে আপিল মামলা দাখিলে তামাদি মওকুফ করা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে জিপি, এডিশনাল জিপি ও এজিপি নিয়োগ। স্থানীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে কালচারাল আর্কাইভ স্থাপন। পর্যটন শিল্পকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে পর্যটন এলাকাগুলোতে সমন্বিত উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ। সব ধরনের অর্থছাড় ১৫ এপ্রিলের মধ্যে সম্পন্ন করা।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে নগদ অর্থ লেনদেনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে (যেমন চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিআরটিএ অফিস, পাসপোর্ট অফিস, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বাড়িভাড়া ইত্যাদি) ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন।
কৃষিপ্রধান জেলাগুলোতে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও খামারিদের জন্য স্বল্পসুদে বৃহৎ আকারে ঋণ সুবিধা প্রদান। মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরি স্থায়ীকরণ এবং বেতন-ভাতা বৃদ্ধি। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে ঢাকা থেকে বিকেন্দ্রীকরণ করে জেলাভিত্তিক করাসহ জনকল্যাণমূলক নানা প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা।