
পবিত্র রমজান কোরআন নাজিলের মাস এবং আত্মশুদ্ধির অনন্য সময়। এ মাস রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে আসে। আল্লাহর কাছে রোজাদারের মর্যাদা অপরিসীম। নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যখন রমজান মাস প্রবেশ করে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৯৯)
হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০৪)
তবে রোজা কেবল উপবাস থাকার নাম নয়। রোজা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সঠিক নিয়ম ও আদব মেনে পালন করা হয়।
রোজার মূল লক্ষ্য: তাকওয়া অর্জন
রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি অর্জন করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩) তাই প্রত্যেক কাজে আল্লাহকে যথাযথ ভয় করা মুমিনের কর্তব্য। (দ্র. সুরা আলে ইমরান: ১০২)
রোজা যখন ‘বিদীর্ণ’ হয়
অনেকে রোজা রেখেও পাপাচার ত্যাগ করেন না। নবীজি (স.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘ যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি: ১৯০৩) অন্য হাদিসে এসেছে, ‘রোজা হলো (জাহান্নাম থেকে বাঁচার) ঢাল, যতক্ষণ না তা বিদীর্ণ (নষ্ট) করে ফেলা হয়।’ (মুসনাদে আহমদ: ১৬৯০) নবীজিকে (স.) জিজ্ঞেস করা হলো- কীভাবে তা বিদীর্ণ হয়? তিনি বললেন, ‘মিথ্যা অথবা গিবতের (পরনিন্দা) মাধ্যমে।’ (তবারানি: ৪৫৩৬)
নিষ্ফল রোজা থেকে সাবধান
রোজার হক আদায় না করলে তা কেবল দৈহিক উপবাসে পরিণত হয়। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘অনেক রোজাদার এমন আছে, যাদের রোজা থেকে উপোস ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হয় না। আর অনেক রাত জেগে ইবাদতকারী এমন আছে, যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই প্রাপ্তি থাকে না।’ (ইবনে মাজাহ: ১৬৯০) এর অর্থ হলো, রোজা রেখে যখন মিথ্যা, গিবত ও মন্দ কাজ পরিহার করা হয় না, তখন সেই রোজার আধ্যাত্মিক কোনো মূল্য থাকে না।
যা বর্জন করা জরুরি
রোজার পূর্ণতা পেতে তাকওয়া-বিরোধী কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমন-
- মিথ্যা বলা, গিবত বা পরনিন্দা ও অশ্লীল কথা-কাজ।
- ধোঁকা দেওয়া, ব্যবসায় অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া বা ওজনে কম দেওয়া।
- হারাম উপার্জন, অপরের সম্পদ হরণ ও অপচয়-অপব্যয়।
- মা-বাবার সঙ্গে অসদাচরণ ও প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট করা।
যা করা প্রয়োজন
রোজাকে সুন্দর ও অর্থবহ করতে নেক আমলের প্রতিযোগিতা করা উচিত-
- বেশি বেশি দান-সদকা ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো।
- কোরআন তেলাওয়াত ও অর্থসহ অধ্যয়ন।
- তারাবি, তাহাজ্জুদ ও জামাতে নামাজ আদায়।
- ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) ও জিকির।
- রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ ও লাইলাতুল কদরের সন্ধান করা।
সতর্কবার্তা
রমজান পেয়েও যে ব্যক্তি পাপ মোচন করতে পারল না, নবীজি (স.) তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলোধূসরিত হোক, যে রমজান পেল অথচ তার গুনাহ মাফ করানোর আগেই তা বিদায় নিল।’ (তিরমিজি: ৩৫৪৫) জিব্রাইল (আ.) যখন বলেছিলেন, ‘ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমজান পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না’, তখন নবীজি (স.) বলেছিলেন, ‘আমিন’। (বায়হাকি: ১৫৭২)
রমজান হলো গুনাহ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াব লাভের আশায় রমজানের রোজা পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০১)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমজানের হক আদায় করে প্রকৃত তাকওয়া অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।