
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংকটাপন্ন অবস্থার খবর সামনে আসার পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তার সুস্থতার জন্য দোয়ার আয়োজন চলছে। প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে দলীয় নেতারা নিয়মিত তার খোঁজখবর নিচ্ছেন।
বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় দোয়ার আয়োজন করেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দলমতের বাইরে গিয়ে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন।
গত দুই-তিন দিনে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবর বেশি প্রকাশ পাওয়ায় সাধারণ মানুষ এবং রাজনীতিবিদরা সক্রিয়ভাবে তার জন্য দোয়া করছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একটি বিবৃতি দিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন।
তারেক রহমান লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ ও সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন। তার রোগমুক্তির জন্য দল-মত নির্বিশেষে দেশের সকল স্তরের নাগরিক আন্তরিকভাবে দোয়া অব্যহত রেখেছেন। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা তার রোগমুক্তির জন্য দোয়ার সাথে সাথে চিকিৎসার সর্বোচ্চ সহায়তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘দেশ-বিদেশের চিকিৎসক দল সর্বোচ্চ মানের পেশাদারিত্ব ছাড়াও সর্বোচ্চ আন্তরিক সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। বন্ধু প্রতীম একাধিক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও উন্নত চিকিৎসাসহ সম্ভাব্য সকল প্রকার সহযোগিতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘সর্বজন শ্রদ্ধেয়া বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সকলের আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করায় জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তির জন্য সকলের প্রতি দোয়া অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানাই।’
এদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার নিয়মিত স্বাস্থ্যের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন এবং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বশীলতা বজায় রেখে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে। দেশবাসীর কাছে তার দ্রুত আরোগ্য কামনায় দোয়া অব্যহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জ্ঞান থাকলেও শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়। আমরা দূরত্ব রেখে কথা বলেছি। ম্যাডাম আমাদের চিনতে পেরেছেন এবং সালামের রিপ্লাই দিয়েছেন। দেশের মানুষের কাছে আমার আবেদন—ব্যক্তিগতভাবেও সবাই তার জন্য দোয়া করুন।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে দলের ভেতরে উদ্বেগ বাড়ছে, তেমনি সমর্থকরাও হাসপাতালের বাইরে ভিড় করছেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনা ‘পথের কাঁটা’ মনে করতেন। সেই কারণে অতীতে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সব রকম চেষ্টা করা হয়েছে।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে ক্ষমতা ভোগ করেছেন নিজের, ছেলে ও পরিবারের স্বার্থে। স্বর্ণ কিনে মজুদ করা, লোকজন দিয়ে ব্যাংক লুট করে টাকা পাচার করানো—এসব নানা অনিয়মের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হয়েছে। সব ছেড়ে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন, তবে জমানো স্বর্ণ নিয়ে যেতে পারেননি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মহান আল্লাহ যেন তাকে দ্রুত সুস্থতা দান করেন, সকল কষ্ট সহজ করে দেন এবং তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দেন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে রোগব্যাধি ও বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন।’
হাসপাতাল সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া বর্তমানে সিসিইউতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে আছেন। মেডিকেল বোর্ড তার শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে হাসপাতালে নেতাকর্মীদের ভিড় না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের দ্রুত ও পূর্ণ রোগমুক্তির জন্য দেশজুড়ে দোয়া জানিয়েছেন আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি)।
দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার দ্রুত, পূর্ণ রোগমুক্তির জন্য গভীর প্রার্থনা জানাই। তার সুস্থতা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালও সামাজিক মাধ্যমে খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করেছেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া জীবনে অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থেকেছেন। এবারও সব শঙ্কা দূর করে তিনি হাসিমুখে ফিরবেন। সবাই তার সুস্থতার জন্য দোয়া করি।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। বিএনপি নেত্রীর জন্য দোয়া করতে তারা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
এদিন দুপুরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে দেখতে যান তারা। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এনসিপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলের এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। এনসিপি নেতারা জানান, সংকটাপন্ন হলেও খালেদা জিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল আছে। চিকিৎসকদের দেওয়া নির্দেশনাও তিনি বুঝতে পারছেন।
এ সময় এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমাদের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে উনাদের যে লড়াই, সেই লড়াইয়ে যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিকে যাচ্ছে, সেটি যেন উনি নিজ চোখে দেখে যেতে পারেন। উনি যে ক্লিনিক্যাল অপারেশনের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, মেডিকেলের অত্যাচারের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। আমার মনে হয় আল্লাহ যেন উনাকে হাসিনার ফাঁসি কার্যকর হওয়া পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, উনার শারীরিকভাবে সঠিক চিকিৎসা জেলের মধ্যে নিতে দেওয়া হয়নি। আমরা শুনেছি, যদি কোনো ডাক্তার উনাকে চিকিৎসা করতে আসতেন, তাকে হয়রানি করা হতো। ১৮ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ডাক্তারকেও ভয়ভীতি দেখানো হতো। এভাবে ক্রমশ বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। সবাই উনার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন উনাকে সুস্থ করে দেন।
চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দেশপ্রেম ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের কারণে প্রায় সবার কাছে বিশেষ সম্মানের ও শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামি বক্তা মাওলানা ড. মিজানুর রহমান আজহারী।
পোস্টে ড. মিজানুর রহমান আজহারী লিখেন, নানা বিভক্তি ও বিভাজনের এ দেশে সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া এ ক্ষেত্রে অনন্য। দেশপ্রেম ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি প্রায় সবার কাছে বিশেষ সম্মানের ও শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত করেছেন।
এ ইসলামি বক্তা বলেন, বর্তমানে তিনি অসুস্থ হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এই মুহূর্তে গোটা জাতি তাকে আন্তরিক দোয়ায় স্মরণ করছে। দলমত নির্বিশেষে অগণন মানুষের এমন দোয়া ও ভালোবাসা পাওয়া সত্যইি পরম সৌভাগ্যের। আমি দেশের তরে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করা ধর্মীয় মূল্যবোধে শ্রদ্ধাশীল এ মহিয়সী নারীর রোগমুক্তি ও সম্পূর্ণ সুস্থতা কামনা করছি। আল্লাহ তাআলা তাকে দ্রুত আরোগ্য দান করুন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে না পারলে সব শ্রমই ‘পণ্ডশ্রম’ হবে। শুধু সংস্কার করলেই হবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীন হয় এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তাহলেই সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম হতে পারে। গণভোটে ৪টি পয়েন্ট থাকলেও মূল পয়েন্ট একটিই, ‘আপনি সংস্কার চান নাকি চান না।
এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসনকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান। তবে বিদেশে যাওয়ার মতো অবস্থায় এলে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে নিবীড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। দেশের বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে কথা বলা আছে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত রয়েছে। বিদেশে যাওয়ার মতো অবস্থায় এলে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে।
নানা রোগে আক্রান্ত প্রায় ৮০ বছর বয়সি খালেদা জিয়া ২৩ নভেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণ এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে আবারও হাসপাতালে ভর্তি হন। বর্তমানে মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সিসিইউতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ধারাবাহিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসা চলছে তার। তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে আসছেন বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
সকালে বেগম জিয়াকে দেখতে আসেন ডাকসুর সাবেক এজিএস ও বিএনপি নেতা নাজিমুদ্দিন আলম। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দলীয় প্রধানের জন্য সবার কাছে দোয়া চান তিনি। পরে দলটির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন জানান, বেগম জিয়ার অবস্থা অপরিবর্তিত। বেগম জিয়ার চিকিৎসা ও বিদেশ নেয়ার প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত নেবে মেডিকেল বোর্ড।
এদিকে, বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ খবর নিতে এসে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বর্তমান শারিরীক অবস্থায় তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব না।
এদিন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবরে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তার রোগমুক্তি কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
শুক্রবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও বিশেষ সহকারী মনির হায়দার খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান।
খালেদা জিয়াকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গত ২৩ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি ভর্তি হন। মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সিসিইউতে তার শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।