১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার
৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত: কাঁটাতারের দুই পাশে জীবনের গল্প

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৪ হাজার ৯৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক স্থলসীমান্ত। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম—ভারতের এই পাঁচটি রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০টির বেশি জেলার সংযোগ রয়েছে এই সীমান্তের মাধ্যমে। কাগজে-কলমে এটি একটি আন্তর্জাতিক সীমানা হলেও বাস্তবে এটি ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, অভিবাসন, মানবাধিকার এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফের আঁকা সীমারেখা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণ করে। কিন্তু সেই বিভাজন শুধু ভূখণ্ডকে ভাগ করেনি; বিভক্ত করেছে পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক, বাজার, কৃষিজমি এবং শতাব্দীপ্রাচীন জনপদকে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পরও সীমান্তকে ঘিরে নানা অমীমাংসিত বিষয় দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে।

দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যা তার মধ্যে অন্যতম ছিল।
২০১৫ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৬২টি ছিটমহলের বিনিময় সম্পন্ন করে। প্রায় ৫১ হাজারের বেশি মানুষ রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীনতার অবস্থা থেকে বেরিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার লাভ করে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এটি সীমান্তসংক্রান্ত সবচেয়ে সফল শান্তিপূর্ণ সমাধানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ছিটমহল সমস্যার সমাধান হলেও সীমান্তকে ঘিরে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং সাম্প্রতিক পুশ-ইন বিতর্ক।

সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় নীতি বা আন্তর্জাতিক কূটনীতির চেয়ে বড় বাস্তবতা হলো জীবিকা। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, ফেনী ও সাতক্ষীরার মতো জেলার লাখো মানুষ সীমান্তকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। সীমান্ত হাট, স্থলবন্দর, কৃষিকাজ, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র বাণিজ্যের মাধ্যমে বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করে সীমান্তের ওপর।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে বেশ কয়েকটি স্থলবন্দর সক্রিয় রয়েছে। বেনাপোল-পেট্রাপোল করিডোর একাই দুই দেশের স্থলবাণিজ্যের বড় অংশ বহন করে। এছাড়া বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা, আখাউড়া-আগরতলা, সোনামসজিদ-মহদিপুর, বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থলবন্দর আঞ্চলিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের পণ্য এই সীমান্ত দিয়ে আদান-প্রদান হয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও ওষুধ যেমন ভারতে যায়, তেমনি ভারত থেকে আসে তুলা, সুতা, খাদ্যপণ্য, শিল্প কাঁচামাল ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য।

তবে সীমান্তের অর্থনীতির আরেকটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। বহু বছর ধরে গবাদিপশু, মাদক, ফেনসিডিল, ইয়াবা, স্বর্ণ, কসমেটিকস ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের চোরাচালান সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত জনবসতির কারণে এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত নিয়ে আলোচনা হলেই যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আবেগ সৃষ্টি করে, তা হলো সীমান্তে প্রাণহানি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে সীমান্তে শত শত বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগের তীর থাকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের দিকে। ভারত বরাবরই দাবি করে এসেছে, সীমান্তে সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনা চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ অথবা সংঘর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করে, প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এবং ভারতের বিএসএফের মধ্যে নিয়মিত মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে সীমান্ত হত্যা, মাদক পাচার, অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বহুবার সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ঘটনাগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে সীমান্ত হত্যা দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোর একটি হিসেবেই রয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু। ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে এবং ২০২৬ সালেও বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় এমন অভিযোগ সামনে আসে যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কিছু মানুষকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে। বিজিবির পক্ষ থেকে একাধিকবার জানানো হয়েছে, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নারী, শিশু ও পুরুষসহ বেশ কিছু মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দাবি করা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে এমন লোকও ছিলেন যাদের নাগরিকত্ব তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এই পুশ-ইন বিতর্কের পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। বিশেষ করে আসাম এবং অন্যান্য সীমান্তবর্তী রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অভিবাসন একটি রাজনৈতিক ইস্যু। নাগরিকত্ব, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC), সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অনথিভুক্ত অভিবাসীদের প্রশ্ন ভারতীয় রাজনীতিতে বারবার ফিরে এসেছে। এর প্রভাব সীমান্ত পরিস্থিতিতেও পড়ছে।

বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট—কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। যথাযথ যাচাই ছাড়া কাউকে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে মনে করে ঢাকা। ফলে পুশ-ইন প্রশ্নটি এখন শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং মানবাধিকারেরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

সীমান্তকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো জলসম্পদ। অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে অধিকাংশই ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তিস্তা, গঙ্গা, ধরলা, দুধকুমার, মহানন্দা কিংবা কুশিয়ারার মতো নদীগুলো সীমান্ত রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পানিবণ্টন, নদীভাঙন, শুকনো মৌসুমে পানির প্রবাহ এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের আলোচনার বিষয়।
নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পানি, অভিবাসন এবং মানবাধিকার—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।

তাই বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সীমারেখা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। এটি একই সঙ্গে সহযোগিতা ও সংঘাতের, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের, বাণিজ্য ও জীবিকার, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও মানবিক বাস্তবতার এক চলমান গল্প। কাঁটাতারের দুই পাশে প্রতিদিন সেই গল্পের নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে।

ফেরদৌস ইসলাম
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

শেয়ার করুন