
দেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মে মাসে সহিংসতার ঘটনায় ৩২ জন নিহত এবং ৭১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৫৩টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল রোববার প্রকাশিত মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে এমএসএফ। জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনটির নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে দেশে ৬৯টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩২ জন নিহত ও ৭১ জন আহত হন। এর আগে এপ্রিল মাসে সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ২১ এবং আহত হন ৪৯ জন। চুরি, ধর্ষণচেষ্টা, জমি-সংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন কারণে এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমএসএফ বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাকেও তারা মব আচরণের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। মে মাসে দেশের বিভিন্ন নদী, সড়ক, রেললাইন ও কৃষিজমি থেকে ৫৩টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও এপ্রিলে এ সংখ্যা ছিল ৫৬, তবু বর্তমান সংখ্যাও উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছে সংগঠনটি। তাদের মতে, এসব ঘটনা সম্ভাব্য বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম কিংবা অপরাধের অপ্রকাশিত মাত্রার ইঙ্গিত দিতে পারে এবং কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহির ঘাটতির বিষয়টি সামনে আনে।
রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র উন্নতির দিকে: রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতির চিত্র পাওয়া গেছে। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন ১৯৩ জন, যা এপ্রিলে ছিল ৩০৩ জন। তবে মে মাসেও রাজনৈতিক সংঘাতে ৩ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ), জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখনো সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সীমান্তে হত্যা বেড়েছে: সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে ১০ জন নিহত হয়েছেন, যেখানে এপ্রিলে নিহতের সংখ্যা ছিল ৮। একই সময়ে সীমান্তে নির্যাতনের শিকার হয়ে আহতের সংখ্যা ২ থেকে বেড়ে ১৩ জনে পৌঁছেছে। এ ছাড়া মে মাসে ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করার ঘটনাও ঘটেছে। এমএসএফের মতে, এসব ঘটনা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকার সুরক্ষার ঘাটতি নির্দেশ করে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু ৭: প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে কারা হেফাজতে ৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং ৪ জন হাজতি ছিলেন। এপ্রিলে কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬। সংগঠনটির ভাষ্য, কারা হেফাজতে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা কারা ব্যবস্থার মানবাধিকার পরিস্থিতির দুর্বলতাকে সামনে আনছে।
সাংবাদিকের চাপের ধরন বদলেছে: সাংবাদিকদের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে এমএসএফ জানিয়েছে, মে মাসে ৩৪ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা এপ্রিলে ছিল ৪৬ জন। তবে শারীরিক হামলার ঘটনা কমলেও আইনি হয়রানি বেড়েছে। সংগঠনটির মতে, সাংবাদিকদের ওপর চাপের ধরন বদলেছে; সরাসরি হামলার পরিবর্তে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘমেয়াদে হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সামগ্রিক মূল্যায়নে এমএসএফ বলেছে, কিছু সূচকে উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনো কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে আইনের শাসনের দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।