১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার
১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নগর স্বাস্থ্যসেবার পুনর্বিন্যাস : ধারাবাহিকতা রক্ষা ও অর্জিত অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন প্রয়োজন

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণের প্রেক্ষাপটে নগর স্বাস্থ্যসেবা আজ একটি বড় নীতিগত ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ। গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্রোত, বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতির বিস্তার, এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি— সব মিলিয়ে নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।

এই প্রেক্ষাপটে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি (ইউপিএইচসিপি) দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করে আসছে, যা নগর দরিদ্রদের দোরগোড়ায় মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছে।

১৯৯৮ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় যাত্রা শুরু করা এই কর্মসূচি ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্বভিত্তিক কাঠামোয় পরিণত হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই মডেলটি শুধু সেবা প্রদানেই নয়, বরং কমিউনিটি-সংযুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং ফলাফলভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি সফল উদাহরণ।

বর্তমানে দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ১৮টি পৌরসভায় এই কর্মসূচির মাধ্যমে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি, এবং বিভিন্ন সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে।

সম্প্রতি এই কর্মসূচিকে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নীতিগতভাবে এই পদক্ষেপটি ইতিবাচক, কারণ এটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের পথে সহায়ক হতে পারে। তবে যে কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মতোই, এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া যদি যথাযথ পরিকল্পনা, সমন্বয় ও পরামর্শ ছাড়া বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা বিদ্যমান সেবার ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় সামনে আসে—প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা। এই সব স্বাস্থ্যকর্মীরা মাসের পর মাস বেতনসহ আর্থিক সুবিধা বঞ্চিত। এছাড়াও করোনাকালে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সেবাদান করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের কোভিড-১৯ টিকা প্রদান করেছে। যখন সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে তখনও এই প্রকল্প ২৪ ঘণ্টা মা ও শিশুদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করেছে।

তাই সার্বিক অবস্থা বিবেচনায়, সেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। নগরাঞ্চলের বিপুল সংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বস্তিবাসী নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, এবং টিকাদান কর্মসূচির জন্য এই সেবাকেন্দ্রগুলোতে আসে। যদি হস্তান্তরের সময় কোনো প্রশাসনিক জটিলতা, অর্থায়ন সংকট, বা দায়িত্ব হস্তান্তরে বিলম্ব ঘটে, তাহলে এই সেবাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ বা ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টি এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্বাস্থ্যখাতে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে হলে সেবার কোনো বিরতি চলবে না—এটি একটি মৌলিক নীতি।

এছাড়া, প্রায় ৪,৫০০ স্বাস্থ্যকর্মীর চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই কর্মীরা শুধু সেবা প্রদানকারী নন; তারা কমিউনিটির সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, স্থানীয় বাস্তবতা বোঝেন এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করেছেন। যদি হস্তান্তরের ফলে তাদের চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে শুধু তাদের জীবিকাই ঝুঁকিতে পড়বে না, বরং পুরো সেবা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দক্ষ জনবল হারালে নতুন করে কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে সময় ও ব্যয় বাড়বে, যা সেবার মানকে সাময়িকভাবে হলেও দুর্বল করে দিতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে এনজিওগুলো এই কর্মসূচির মাধ্যমে নগর স্বাস্থ্যসেবায় উদ্ভাবনী পদ্ধতি, কমিউনিটি সম্পৃক্ততা এবং ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করেছে। তাদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার দক্ষতা এই কর্মসূচির মূল শক্তি। তাই হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় এই অভিজ্ঞতাকে অবমূল্যায়ন না করে বরং কাজে লাগানো প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সময় ‘continuity of care’ এবং ‘workforce protection’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অনেক দেশেই দেখা গেছে, যদি এই দুই বিষয় উপেক্ষিত হয়, তাহলে স্বল্পমেয়াদে সেবার মান কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে; তাই এই ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়নে সতর্কতা ও দূরদর্শিতা প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য হস্তান্তর পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। কোন পর্যায়ে কোন দায়িত্ব কার কাছে যাবে, কীভাবে অর্থায়ন চলমান থাকবে, কর্মীদের কীভাবে অন্তর্ভুক্ত বা পুনর্বিন্যাস করা হবে— এসব বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, এনজিও এবং অন্যান্য অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা প্রদানের বিষয়টি শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান কর্মীদের ধরে রাখা মানে অভিজ্ঞতা ধরে রাখা, কমিউনিটির আস্থা ধরে রাখা এবং সেবার মান বজায় রাখা। প্রয়োজন হলে তাদের ধাপে ধাপে সরকারি কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত করা, চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা, বা সমমানের পদে পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির এই হস্তান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং বাস্তবসম্মত হস্তান্তর প্রক্রিয়াই পারে এই কর্মসূচির অর্জনগুলোকে ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নিতে।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

 

শেয়ার করুন