৩০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার
১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন রক্ষায় ৫৫০ কোটি ডলারের তহবিল গঠনে সম্মত ৫৩ দেশ

শেয়ার করুন

বিশ্বে বন রক্ষায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন (৫৫০) ডলারের বেশি তহবিল গঠনে সম্মত হয়েছে ব্রাজিলসহ ৫৩টি দেশ। ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরেভার ফ্যাসিলিটির (টিএফএফএফ) জন্য এ তহবিল ব্যবহার করা হবে। গত ৭ নভেম্বর ব্রাজিলের বেলেমে দেশটির প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার সভাপতিত্বে এ-সংক্রান্ত সভায় ৩০টির বেশি দেশের সরকারপ্রধান, জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

এ চুক্তিতে সমর্থন করা দেশগুলো বিশ্বের ৯০ শতাংশ রেইন ফরেস্টের প্রতিনিধিত্ব করে। এসব দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ব্রাজিল, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও কঙ্গো। টিএফএফএফের লক্ষ্য হলো একটি স্থায়ী বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনগুলোর বাস্তুতন্ত্রের রক্ষা করা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া। পাশাপাশি স্থায়ী বন ধ্বংস করার পরিবর্তে সংরক্ষণ করা।

তহবিল গঠনে নরওয়ে আগামী ১০ বছরে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (শর্তসাপেক্ষে), ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়া ১ বিলিয়ন ডলার, ফ্রান্স ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ইউরো, পর্তুগাল ১ মিলিয়ন ডলার, নেদারল্যান্ডস ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জমা দেবে। জার্মানি পরে এ তহবিলের অর্থ ঘোষণা করবে। বিশ্বব্যাংককে এ তহবিলের জন্য ট্রাস্টি এবং অন্তর্বর্তীকালীন আয়োজক হিসেবে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট সিলভা গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে টিএফএফএফকে একটি অভূতপূর্ব উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসা করেন। দেশটির পরিবেশমন্ত্রী মারিনা সিলভা এ সময়কে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণের ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বন সংরক্ষণের জন্য স্থায়ী প্রণোদনা প্রদান এবং স্থায়ী জলবায়ু সমাধান তৈরির কেন্দ্রবিন্দুতে ব্রাজিলকে স্থান দেয়।

জলবায়ু সম্মেলন সামনে রেখে বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য:

বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা বৃদ্ধি এবং বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ক্ষয়প্রবণতা—এই তিন বিপদের মুখোমুখি। কপ৩০ সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বার্থ শুধু কূটনৈতিক নয়, এটি টিকে থাকা, সহনশীলতা এবং জলবায়ু ন্যায়ের প্রশ্ন।

সম্প্রতি দেওয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের পরিবেশ ও পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দেশটি কপ৩০-এ উদ্যমী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ফল অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি একই সঙ্গে আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রাজিলের ভূমিকা ও অংশীদারত্বের গুরুত্বও তুলে ধরেন।

কপ৩০ থেকে বাংলাদেশের মূল প্রত্যাশা জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন: বাংলাদেশ জোর দিয়ে বলছে, কার্বন বাজার কোনোভাবেই অর্থায়নের প্রতিশ্রুতির বিকল্প হতে পারে না, বিশেষ করে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কর্মসূচির ক্ষেত্রে। রিজওয়ানা হাসান বলেন, কার্বন মার্কেট জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতির বিকল্প নয়।

ধারা-৬ অনুযায়ী কার্বন বাজার ও সুন্দরবন সংরক্ষণুবাংলাদেশ প্যারিস চুক্তির অধীনে ধারা-৬ ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে কাজ করছে, যাতে সুন্দরবন সংরক্ষণে অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়া যায়। তবে এর ক্ষেত্রে পরিবেশগত সুরক্ষা ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও নতুন জলবায়ু কাঠামো প্রস্তুতি পর্যায়ে বিদ্যমান চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন, বহুপাক্ষিকতা জোরদার এবং জাতীয় প্রতিশ্রুতির ঘাটতি পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ আশা করছে, কপ৩০ শুধুই প্রতিশ্রুতিতে নয়—বাস্তব ফলাফলেও পরিণত হবে।

ন্যায্য বাণিজ্য ও অংশীদারত্ব—জলবায়ু ইস্যুর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্রাজিলকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে বাণিজ্য সম্পর্ক, প্রযুক্তি বিনিময় (যেমন জৈব জ্বালানি ও টেকসই কৃষি) এবং দুর্যোগ সহনশীলতা উদ্যোগে সহযোগিতা—সবকিছুই আলোচনায় এসেছে।

কেন এই কপ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ:

ব্রাজিলে আয়োজিত কপ৩০ বাংলাদেশকে এক নতুন সুযোগ দিয়েছে, যেখানে জলবায়ু ন্যায়বিচার, বন সংরক্ষণ, অভিযোজন ও অর্থায়নের পারস্পরিক সম্পর্ককে জোর দিয়ে তুলে ধরা যাবে।

বাংলাদেশের জন্য এটি এমন এক সুযোগ, যেখানে বিশ্বকে মনে করিয়ে দেওয়া যায়—শুধু নিঃসরণ হ্রাসই যথেষ্ট নয়; অভিযোজনের জন্য পূর্ণ অর্থায়ন দরকার, দরিদ্র দেশগুলোর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হবে এবং কার্বন বাজার যেন প্রকৃত সরকারি অর্থায়নকে ছাপিয়ে না যায়।

শেয়ার করুন