১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার
১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দন্ডবিধি আলোচনা

শেয়ার করুন

দন্ডবিধি আইনের বিষয় আলোচনায়

মোঃ আব্দুল জব্বার ফকির

ডভোকেট

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ঢাকা।

আজকে আমি ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি আইনের ৩২৩, ৩২৪,৩২৫ ও ৩২৬ ধারা নিয়ে আলোচনা করবো। ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি আইন একটি অপরাধের শাস্তির বিধান নিশ্চিত মুলক আইন, যাহাকে ১৮৬০ সালের ৪৫ নং দন্ডবিধি আইন হিসাবে অবহিত করা হইয়াছে। অত্র দন্ডবিধি আইনে সর্বমোট ৫১১ টি ধারা আছে। উক্ত ধারাসমুহে পৃথক পৃথক ভাবে অপরাধের শাস্তির বিধান উল্লেখ আছে। উক্ত ধারা সমুহের মধ্যে দন্ডবিধি আইনের ৩২৩, ৩২৪,৩২৫ ও ৩২৬ ধারা খুবই গুরুত্বপুৃর্ন। বাংলাদেশের ফৌজদারী আদালত গুলোতে উক্ত ধারাগুলোর আলোকে সবচেয়ে বেশি মামলা মোকদ্দমা ও বিচার হয়ে থাকে। শহরে গ্রামগঞ্জে কোন ধরনের সহিংস মারামারী হওয়ার পর কেউ যদি শরীরে আঘাতপ্রাপ্ত হয় অথবা গুরুত্বর কাটা রক্তাক্ত জখমপ্রাপ্ত হয় তবে অত্র ধারাসমুহের আলোকে অপরাধীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় বা বিজ্ঞ আদালতে যে কোন ব্যক্তি মামলা বা অভিযোগ দায়ের করতে পারে। দন্ডবিধি আইনের ৩২৩ ধারায় বলা আছে কোন লোক যদি ধারা ৩৩৪ এর উল্লেখিত ক্ষেত্র ছাড়া ইচ্ছাকৃত ভাবে কাউকে সাধারণ আঘাত দান করে শরীরে নিলাফুলা জখম করে তা হলে সে লোক যে কোন বর্ণনার কারাদন্ডে দন্ডিত হবে যার মেয়াদ এক বৎসর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদন্ড হতে পারে যার পরিমান এক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। উক্ত ধারার অপরাধ আপোস যোগ্য।

দন্ডবিধি আইনের ৩২৪ ধারা- কোন লোক যদি ধারা ৩৩৪ এ উল্লেখিত ক্ষেত্র ছাড়া অপর কোন ক্ষেত্রে গুলিবর্ষনের, ছুরিকাঘাত করার বা কাটার যে কোন যন্ত্র, হাতিয়ার এর মাধ্যমে আঘাত করে বা যে হাতিয়ার একটি অপরাধ সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে মৃত্যু ঘটতে পারে, সে অস্ত্র এর মাধ্যমে আঘাত করে বা অগ্নি বা উত্তপ্ত বস্তুর মাধ্যমে আঘাত করে বা যে কোন বিষ বা ক্ষয়কারী দ্রব্যের মাধ্যমে আঘাত করে বা কোন বিস্ফোরক দ্রব্য দিয়ে আঘাত করে বা এমন কোন দ্রব্য যা নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহন করলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হয় সে দ্রব্যের মাধ্যমে আহত করে বা যেকোন প্রাণীর সাহায্যে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত প্রদান করে তাহলে সে লোক যে কোন বর্ণনার কারাদন্ডে যার মেয়াদ তিন বৎসর পর্যন্ত হতে পারে বা জরিমানা দন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। উক্ত ধারার অপরাধ আদালতের অনুমতিক্রমে আপোস যোগ্য।

দন্ডবিধি আইনের ধারা ৩২৫- কোন লোক যদি ধারা- ৩৩৫ এ উল্লেখিত ক্ষেত্র ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে গুরু আঘাত প্রদান করে (ভোতা অস্ত্রের আঘাত) তাহলে সে লোক যেকোন বর্ণনার কারাদন্ডে দন্ডিত হবে যার মেয়াদ সাত বৎসর পর্যন্ত হতে পারে ও জরিমানাদন্ডে ও শাস্তিযোগ্য হবে। উক্ত ধারার অপরাধ আদালতের অনুমতিক্রমে আপোস যোগ্য।

দন্ডবিধি আইনের ৩২৬ ধারা অপরাধ প্রমান করার জন্য দন্ডবিধি আইনের ৩২০ ধারায় যে ৮ টি উপাদানের কথা উল্লেখ আছে তাহার যে কোন একটি উপাদান অপরাধ হিসেবে প্রমান করা দরকার পড়ে তাই উক্ত যে কোন একটি উপাদান ছাড়া কোন গুরুত্বর জখমের অপরাধ হলেই তাহা ৩২৬ ধারার অপরাধ হিসাবে গন্য হয় না। উক্ত ধারায় বলা আছে- কোন লোক যদি ধারা ৩৩৫ এ উল্লেখিত ক্ষেত্র ছাড়া গুলিবর্ষণের, ছুরিকাঘাত করার বা কাটার যে কোন যন্ত্র বা অপর যেকোন যন্ত্র যার ব্যবহারে মৃত্যু ঘটাবার আশংকা রয়েছে বা অগ্নি বা উত্তপ্ত বস্তু বা যেকোন বিষ বা কোন ক্ষয়কারক পদার্থ বা কোন বিস্ফোরক দ্রব্য বা এরুপ কোন দ্রব্য যা নিঃ শ্বাসের সঙ্গে গ্রহন করা, ভক্ষন করা বা রক্তে গ্রহন করা মানব দেহের পক্ষে ক্ষতিকর বা যে কোন প্রাণীর সাহায্যে ইচ্ছাকৃত ভাবে গুরুত্বর আঘাত দান করে তাহলে সে লোক যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা যেকোন বর্ণনার কারাদন্ডে- যার মেয়াদ দশ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে এরুপ দন্ড দন্ডিত হবে এবং অত্র সাথে জরিমানা দন্ডে ও দন্ডিত হবে। উক্ত ধারার অপরাধ আপোস যোগ্য নয়। ইহা ছাড়া গুরুত্বর অপরাধ দমনে ৩২৬ক ধারা নামে আর ও একটি অতিরিক্ত ধারা উক্ত আইনে সন্নিবেসিত করা হইয়াছে। উক্ত ধারায় বলা হইয়াছে যে, যদি কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে অপর কোন লোকের দুইটি চোখ উপড়াইয়া বা এসিড জাতীয় পদার্থ দ্বারা চোখ দুইটির দৃষ্টি নষ্টকরণ বা মুখমন্ডল বা মস্তক এসিড এর মাধ্যমে বিকৃতি করার জন্য সে ব্যক্তি গুরুত্বর আঘাত দান করে তাহলে তাকে মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে ও অত্র সাথে জরিমানা দন্ডে দন্ডিত করা যাবে। উক্ত ধারার অপরাধ আপোস যোগ্য নয়, বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতে বিচার্য। বিজ্ঞ আদালতে উক্ত ধারা সমুহের অপরাধ গুলো সঠিক সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে অভিযোগকারীর প্রমান করতে হয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ স্বাক্ষী প্রমানের অভাবে উক্ত ধারা সমুহের অপরাধের অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকোর দিয়ে নির্দোষ প্রমান হয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীর দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি হয় না। যাহার ফলে সমাজে অপরাধ প্রবনতা বেড়েই চলছে। তাই সমাজ থেকে অপরাধ প্রবনতা কমাতে হলে সুষ্ঠ বিচারের মাধ্যমে অপরাধীর দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি নিশ্চিত করে সত্যিকারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই আমরা আগামীর একটা সুন্দর সুশৃংখল বাংলাদেশ গড়তে পারবো।

শেয়ার করুন