২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার
১৩ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফুটবল নিয়ে এত উন্মাদনা কেন

শেয়ার করুন

আমার বাবা ফুটবল খেলতেন। ভালো ফুটবলার হিসেবে তার বেশ নামডাকও ছিল। আশপাশের এলাকাগুলোয় উচ্চমূল্যে তিনি হায়ারে খেলতেন। ভালো ছাত্র হওয়ার পরও শুধু খেলার নেশার কারণে তিনি পড়াশোনাটা ঠিকমতো করতে পারেননি। মোটামুটি বোহেমিয়ান জীবন কাটিয়েছেন। আমরা মজা করে তাকে বলতাম, দুস্থ খেলোয়াড়। সে কারণেই হয়তো আমার মধ্যে ফুটবল উন্মাদনা তৈরি হয়নি। তবে বাড়িতে টেলিভিশন আসার পর জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা আমি তার সঙ্গে বসেই দেখেছি। ৯০ মিনিটের সেই টানটান উত্তেজনা, পেনাল্টি, ফ্রি-কিক আর লাল-হলুদ কার্ডের শোরগোল এখন শুধুই স্মৃতি!

আমার হাজব্যান্ডের পছন্দের দল উরুগুয়ে। কেন? যুক্তিটা অদ্ভুত। প্রথম বিশ্বকাপ উরুগুয়ে জিতেছে। দেশটা খুবই দরিদ্র। সেখানকার একজন প্রেসিডেন্ট নাকি অত্যন্ত সৎ ও সাধারণ জীবনযাপন করতেন! কারও কারও দল নির্বাচনে এসবও কাজ করে হয়তো!

আর আমার ছেলেকে দেখছি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা নিয়ে খুব কথা বলছে। প্রতিদিন এক-একটা দেশের জার্সি কেনার বায়না নিয়ে আসছে। কিন্তু কোনোটাই তার পছন্দ হচ্ছে না। কেনাও হচ্ছে না। বুঝতে পারছি না—তার প্রিয় দল কোনটা!

এই হলো ফুটবল নিয়ে আমার বর্তমান পরিবারের অবস্থান। পুরো দেশের কী অবস্থা? আসলে বাংলাদেশে ক্রিকেট, ক্রিকেট দলের র‌্যাংকিং বা খেলার মান নিয়ে যত আলোচনায় থাকুক না কেন, চার বছর পর পর যখন বিশ্বকাপ ফুটবল আসে, তখন এ দেশের চেহারা বদলে যায়। বাংলাদেশ কখনো বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে যেতে পারেনি, নিকট বা দূরবর্তী ভবিষ্যতেও খেলার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সেই দেশের আনাচে-কানাচে, ছাদে-বারান্দায় উড়তে থাকে হাজার মাইল দূরের দুটি দেশের পতাকা—ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা।

তবে এ সমর্থন কিন্তু কেবল টিভির পর্দার সামনে বসে হাততালির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি রূপ নেয় বাড়ির ছাদ রাঙানোর উন্মাদনা থেকে শুরু করে, পাড়া-মহল্লার চায়ের কাপে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তীব্র কাদা-ছোড়াছুড়িতে এবং দুর্ভাগ্যবশত কখনো কখনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও।

নিজের দেশের কোনো অংশগ্রহণ না থাকা সত্ত্বেও কেন এ দেশের মানুষ ফুটবল নিয়ে এত মাতামাতি করে? আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের এ অন্ধ সমর্থন কেন এ দেশের মানুষকে একে অপরের প্রতি ‘চরম বিদ্বেষী’ করে তোলে? কেন নিজের দেশের চেয়েও দূরের কোনো দেশের জার্সি গায়ে জড়িয়ে মানুষ মারামারিতে লিপ্ত হয়? এ ফুটবল আবেগের পেছনে কোন মনস্তত্ত্ব কাজ করছে?

আসলে আমাদের দেশের মানুষের বিনোদনের সুযোগ খুবই সীমিত। তাদের বিকল্প কোনো বিনোদন নেই। ভালো নাটক বা মুভি দেখবে, ক্লাবে যাবে, পার্কে যাবে—এসবের ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য একেবারেই নেই। সারা দিন সে কর্মক্লান্ত থাকে, সংসারের ঘানি টানতে টানতে টায়ার্ড হয়ে যায়। আর তখন সে নির্মল বিনোদন খোঁজে। অর্থাৎ কাজের চাপ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ পালানোর পথ খোঁজে। ফুটবল এ দেশের মানুষের কাছে সেই অবদমিত আবেগ ও হতাশা প্রকাশের একটি বড় মাধ্যম। আবার বিনোদন কিন্তু বেশিক্ষণ একা একা করা যায় না। মানুষ সঙ্গ খোঁজে। বিনোদনের সময় বন্ধু-বান্ধবকে চায়। বিশ্বকাপ ফুটবল মানুষকে এ ব্যবস্থাটা করে দেয়।

আর ম্যাচকে কেন্দ্র করে যে ঝগড়া বা মারামারি হয়, তা মূলত ফুটবল নিয়ে নয়; প্রথমে এটা শুরু হয় ফান দিয়ে। প্রথমে একজন আরেকজনকে উপহাস করে। মজা করে। পরে তা অনেক সময় ব্যাপক আকার ধারণ করে। এর মাধ্যমে আসলে মানুষের ভেতরের জমে থাকা আগ্রাসী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। নিজের জীবনের না-পাওয়ার বেদনাগুলো মানুষ ভুলে থাকতে চায় প্রিয় দলের জয়ে। আর এই অতি-আবেগ যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখনই তা চরম সহিংসতায় রূপান্তরিত হয়।

কিন্তু কথা হচ্ছে, এদেশের অধিকাংশ মানুষ কেন ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকেই সাপোর্ট করে? আসলে বেশিরভাগ মানুষ তাদের বিনোদন বা উত্তেজনাটাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায়। অন্য দলের সাপোর্টার হলে, ফাইনালে যাওয়ার চান্স হয়তো কম থাকবে। একেবারে ফাইনাল পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা থাকে তাদের মধ্যে। তারা মনে করে—এমন দলকে সাপোর্ট করতে হবে, যার জন্য বলার মতো অনেকেই থাকে। এ ছাড়া এ দেশের বহু মানুষ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার বাইরে অন্য কোনো দেশ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেই না। ফলে আমার হাজব্যান্ডের মতো কেউ কেউ অন্য দেশ সমর্থন করলেও, সংখ্যাটা এত কম যে—সেগুলো কেউ গনায় ধরে না।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থনের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। আশির দশকে যখন রঙিন টেলিভিশন এবং বিটিভির সম্প্রচার বাড়ছে, ঠিক তখনই বিশ্ব ফুটবল শাসন করছিলেন ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় এ দেশের মানুষের মগজে গেঁথে যায়। সে সময় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ এ দেশের মানুষকে এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আবেগে উদ্বেলিত করে। অন্যদিকে, পেলের নান্দনিক ফুটবল ব্রাজিলের প্রতিও এক বিশাল ফ্যানবেস তৈরি করেছে।

আবার লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসও আমাদের কাছাকাছি। ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হওয়া ভূখণ্ডের মানুষ হিসেবে, ইউরোপের পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার এ ফুটবলারদের মাঠের যুদ্ধ বাঙালিকে তখন গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল। ফলে এ দুই দলের সমর্থন কোনো যুক্তি মেনে নয়, বরং তৈরি হয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্য এবং শৈশবের নস্টালজিয়া থেকে। তাই বাবার পছন্দের দল বেছে নেয় ছেলে। আর এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ উন্মাদনা প্রবাহিত হয়।

তবে আধুনিক ফুটবলে দল নয়, অনেক সময় খেলোয়াড়ই হয়ে ওঠে সমর্থনের কেন্দ্র। মেসি বা নেইমারের মতো তারকা শুধু খেলোয়াড় নন, তারা একেকটি আবেগের প্রতীক। তাদের ব্যক্তিত্ব, সংগ্রামের গল্প, সাফল্য—সবকিছু মিলে মানুষ তাদের সঙ্গে নিজের জীবনকে মিলিয়ে দেখে। ফলে সেই খেলোয়াড়ের দলও হয়ে ওঠে নিজের দল। এ ছাড়া মানুষ স্বভাবগতভাবেই কোনো না কোনো শক্তিশালী দলের বা গোষ্ঠীর অংশ হতে চায়, যা তার নিজের আত্মসম্মানকে বাড়িয়ে দেয়। যেহেতু বাংলাদেশ ফুটবলে বৈশ্বিক পর্যায়ে কোনো সাফল্য নেই, তাই এ দেশের ফুটবলপ্রেমীরা তাদের অধরা ‘বিজয়’ বা ‘গর্ব’ খোঁজার জন্য ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে বেছে নেয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব। নিজের দেশের অপ্রাপ্তির বেদনাকে ভুলে থাকতে মানুষ সাময়িকভাবে অন্য একটি পরাশক্তির জয়ে নিজের অস্তিত্ব ও আনন্দ খুঁজে পায়। এটি মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দেয়।

তখন নিজের দলকে সেরা প্রমাণ করার জন্য প্রতিপক্ষ দলকে ছোট করা, ট্রল করা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এক ধরনের মানসিক অভ্যাসে পরিণত হয়। এই মানসিকতা যখন চরম রূপ নেয়, তখন প্রতিপক্ষ দলের প্রতি কোনো সম্মান থাকে না। ইন্টারনেটের যুগে এটি আরও প্রকট হয়েছে। বর্তমান সময়ে এই উন্মাদনা ও শত্রুতার আগুনে ঘি ঢালছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ট্রল পেজ, মিম এবং কড়া ভাষার স্ট্যাটাস তরুণ প্রজন্মকে চরমপন্থি আচরণে উসকে দেয়। ভার্চুয়াল জগতের এ অহংকার ও আক্রমণাত্মক ভাষা বাস্তব জীবনেও প্রভাব ফেলে। এর ফলে খেলা শেষে বা খেলা চলাকালীন সময়ে সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে শুরু করে লাঠালাঠি, এমনকি প্রাণহানির মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। আর ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা মূলত আমাদের সামাজিক সহনশীলতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।

হাজার মাইল দূরের একটা দেশের জয়ে আনন্দিত হওয়া বা কেঁদে ভাসানোর মধ্যে এক অদ্ভুত আবেগ আছে, যা মানবজাতির একাত্মতার কথাই স্মরণ করায়। কিন্তু আবেগ যখন উগ্রতায় রূপ নেয়, যখন প্রিয় দলের হার সহ্য করতে না পেরে মানুষ প্রতিবেশীর ওপর চড়াও হয়, মারামারি করে, এমনকি আত্মহত্যার মতো চরম পথও বেছে নেয়—তখন বিষয়টি আর ‘ফুটবলপ্রেম’ থাকে না। তখন এটি এক ধরনের মানসিক ব্যাধিতে রূপ নেয়। কারণ অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না যে, এটি শুধু একটি খেলা। খেলাকে জীবনের চেয়েও বড় করে দেখা, ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারা—এসবই আসে আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভাব থেকে। ফলে সামান্য কথার জের ধরেই বড় সংঘাত তৈরি হয়।

অথচ ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা—কোনো দেশই হয়তো জানে না যে, মানচিত্রের এই ছোট্ট বদ্বীপে তাদের নিয়ে এতটা রক্তক্ষয় হয়। তাই ফুটবলকে বিনোদন হিসেবেই দেখা উচিত, যুদ্ধের ময়দান হিসেবে নয়। বিশ্বকাপের এই জোয়ার আসুক, পতাকা উড়ুক, চায়ের কাপে তর্ক হোক—কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই শত্রুতা বা সহিংসতায় রূপ না নেয়। সমর্থন হোক আনন্দের, সুস্থ বিনোদনের।

লেখক: সাইকোলজিস্ট

শেয়ার করুন