১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার
৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোন বয়সের পর নারীদের হাড় দুর্বল হতে শুরু করে?

শেয়ার করুন

ত্বকের যত্ন, ওজন নিয়ন্ত্রণ কিংবা হরমোনজনিত পরিবর্তন; নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় এসব বিষয় প্রায়ই গুরুত্ব পায়। কিন্তু নীরবে শরীরের ভেতরে চলতে থাকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়। সেটি হলো হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর নারীদের হাড় ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ না থাকায় অধিকাংশ নারী বিষয়টি বুঝতেই পারেন না। অথচ সময়মতো সচেতন না হলে ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।

৩৫-এর পর শরীরে শুরু হয় নীরব পরিবর্তন

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের হাড়ের সর্বোচ্চ শক্তি বা ‘পিক বোন মাস’ সাধারণত ২০-এর শেষ ভাগ কিংবা ৩০-এর শুরুর দিকে পৌঁছায়। এরপর শরীরে হাড় ভাঙা ও নতুন হাড় তৈরির ভারসাম্য বদলে যেতে শুরু করে।

নয়াদিল্লির মণিপাল হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. ললিত নেমিচাঁদ বাফনা বলেন, অনেক নারীই ৩০-এর দশকে হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা ভাবেন না। অথচ এ সময় থেকেই শরীরে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। ৩৫ বছরের পর শরীরে হাড় ক্ষয়ের গতি নতুন হাড় তৈরির চেয়ে দ্রুত হয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে।

তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই পরিবর্তনের শুরুতে সাধারণত কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। না থাকে ক্লান্তি, না থাকে দৃশ্যমান দুর্বলতা। দীর্ঘদিন নীরবে হাড় ক্ষয় হতে থাকে, পরে গিয়ে সেটি ভাঙন বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হিসেবে ধরা পড়ে।

শুরুতে হাড় ক্ষয় টের পাওয়া যায় না

হাড় দুর্বল হওয়ার সবচেয়ে জটিল দিক হলো, প্রথম দিকে এটি শরীরে তেমন কোনো অনুভূতি তৈরি করে না। ফলে অনেকেই ধরে নেন সবকিছু স্বাভাবিক আছে।

প্রথম দিকের কিছু লক্ষণ হতে পারে—

    • উচ্চতা সামান্য কমে যাওয়া
    • মাঝেমধ্যে পিঠে ব্যথা
    • সামান্য পড়ে গেলেও হাড় ভেঙে যাওয়া

তবে এসব লক্ষণ দেখা দেওয়ার সময় পর্যন্ত হাড়ের ঘনত্ব অনেকটাই কমে যেতে পারে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতে বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের মধ্যে অস্টিওপোরোসিস অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে তখনই, যখন হাড় ভেঙে যায়।

অস্টিওপোরোসিস আসলে কী?

অনেকে অস্টিওপোরোসিসকে শুধু ‘হাড় দুর্বল হওয়া’ বলে ভাবেন। কিন্তু এটি আসলে হাড়ের গঠনগত পরিবর্তন।

স্বাভাবিক হাড়কে যদি ঘন স্পঞ্জের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে অস্টিওপোরোসিসে সেই স্পঞ্জের ভেতরে বড় বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। ফলে হাড় হালকা, ভঙ্গুর ও চাপ সহ্য করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।

নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ে কেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বয়স নয়; জীবনযাপন, হরমোন এবং শারীরিক পরিবর্তনের কারণেও নারীদের হাড় দ্রুত দুর্বল হতে পারে।

হরমোনের পরিবর্তন

ইস্ট্রোজেন হরমোন হাড়কে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মেনোপজের আগেই এই হরমোনের মাত্রা ওঠানামা শুরু হয়। সেই পরিবর্তন ধীরে ধীরে হাড়ের শক্তিতে প্রভাব ফেলে।

ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি

ব্যস্ত নগরজীবনে অনেক নারীর শরীরে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি পৌঁছায় না। এনআইএইচ-এর একাধিক গবেষণায় ভারতীয় নারীদের মধ্যে ব্যাপক ভিটামিন ডি ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে।

কম শারীরিক পরিশ্রম

হাড় শক্ত রাখতে শরীরচর্চা জরুরি। হাঁটা, ব্যায়াম বা ওজন বহনের মতো কাজ শরীরকে হাড় মজবুত রাখতে সংকেত দেয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার অভ্যাস সেই প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে।

গর্ভধারণ ও বুকের দুধ খাওয়ানো

গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে শরীর থেকে প্রচুর ক্যালসিয়াম ব্যবহার হয়। সঠিকভাবে পুষ্টি পূরণ না হলে হাড়ের রিজার্ভ কমে যেতে পারে, যা কখনো কখনো দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে।

যে পরীক্ষাটি অনেক নারী দেরিতে করেন

হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করার জন্য ডেক্সা স্ক্যান করা হয়। এটি সহজ, ব্যথাহীন এবং খুব কম সময়ের একটি পরীক্ষা।

তবু অধিকাংশ নারী এই পরীক্ষা করানোর কথা ভাবেন অনেক দেরিতে। অনেকের ধারণা, হাড়ের পরীক্ষা শুধু বয়স্কদের জন্য প্রয়োজন। এই ভুল ধারণার কারণেই প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা ধরা পড়ে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়মতো স্ক্রিনিং ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে হাড় ভাঙার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

হাড় ক্ষয় ধীর করতে কী করবেন?

৩৫-এর পর শরীর আগের মতো দ্রুত হাড় তৈরি করতে না পারলেও সঠিক যত্নে ক্ষয় ধীর করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা যেসব অভ্যাসে গুরুত্ব দিচ্ছেন—

    • নিয়মিত হাঁটা, যোগব্যায়াম বা ওজন বহনের ব্যায়াম
    • খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ
    • প্রতিদিন কিছু সময় রোদে থাকা, যাতে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়
    • স্ট্রেন্থ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে হাড় ও পেশি শক্ত রাখা

গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। কখনো কখনো হাড় ভাঙার কারণে ভার্টিব্রোপ্লাস্টি বা জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্টের মতো চিকিৎসাও লাগতে পারে।

যে বিষয়টি নিয়ে খুব কম কথা হয়

৩৫-এর পর হাড় ক্ষয় নাটকীয়ভাবে শুরু হয় না। এটি ধীরে ধীরে, নীরবে শরীরে জায়গা করে নেয়। আর ঠিক এ কারণেই বিষয়টি অনেক সময় গুরুত্ব পায় না।

ত্বকের যত্ন নিয়ে আলোচনা হয়, ওজন নিয়ে উদ্বেগ থাকে; কিন্তু হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলক অনেক কম।

অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন সুস্থ হয়ে উঠতেও সময় বেশি লাগে, জটিলতাও বাড়ে।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

 

শেয়ার করুন