
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বুকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্থান কোনো সাধারণ স্থাপনা নির্মাণের ইতিহাস নয়—এটি ছিল এক জাতীয় আত্মপরিচয়ের সন্ধান। ১৯৬০ সালে, যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিজস্ব পথ খুঁজছিল, তখনই ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে এই জাতীয় মসজিদ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের শাসনামলে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়, আর মূল নকশা তৈরি করেন স্থপতি আবদুর রহমান। স্থান হিসেবে নির্বাচিত হয় ঢাকার কেন্দ্রস্থল, যা তখন শহরের হৃদয় বলা হতো। উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি মসজিদ নির্মাণ করা, যা হবে মক্কার কাবা শরিফের আধ্যাত্মিক প্রতিরূপ এবং মুসলিম ঐক্যের প্রতীক।
মসজিদটির নামকরণ করা হয় বাইতুল মোকাররম, যার অর্থ “সম্মানিত ঘর”। নামটি সরাসরি ইসলামের পবিত্রতম স্থান কাবা শরিফের নাম “বাইতুল্লাহ আল-হারাম”-এর প্রতিধ্বনি বহন করে। এই নামই বোঝায়, মসজিদটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি মুসলমানদের হৃদয়ের কেন্দ্র।
১৯৬৮ সালে মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ হয়। তখন থেকেই এটি শুধু ধর্মীয় ইবাদতের জায়গা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক জীবনেরও এক প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাইতুল মোকাররম চত্বর বহু রাজনৈতিক সমাবেশ ও মানববন্ধনের সাক্ষী হয়েছে। স্বাধীনতার পর এটি রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রধান স্থান হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় ইতিহাসবিদদের মতে, বাইতুল মোকাররম শুধু স্থাপত্য নয়, এটি জাতীয় চেতনার প্রতীক। স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকে এটি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

স্থাপত্য: মক্কার আদলে গড়া এক মহিমান্বিত নিদর্শন
স্থাপত্যের দিক থেকে বাইতুল মোকাররম দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যতিক্রমী মসজিদ। এর নকশায় অনুসরণ করা হয়েছে মক্কার পবিত্র কাবা শরিফের ঘনকাকৃতি আদল, যা সরলতার মধ্য দিয়ে ঈমান ও ঐক্যের বার্তা বহন করে।
মসজিদটির উচ্চতা প্রায় ৯৯ ফুট, দৈর্ঘ্য ২৪৬ ফুট এবং প্রস্থ ২৪৬ ফুট। এটি আটতলা বিশিষ্ট, যেখানে একসঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। স্থাপত্যে রয়েছে আধুনিক কাঠামোগত নকশা ও প্রথাগত ইসলামী নান্দনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন।
ভেতরের দিকের মিহরাব ও মিম্বার অত্যন্ত সরলভাবে নকশা করা হয়েছে। এখানে অতিরিক্ত কারুকাজ নেই; বরং ধূসর পাথর, সাদা দেয়াল ও খোলা ছাদের সংমিশ্রণ একটি শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। ছাদের ওপর বিশাল খোলা জায়গা রাখা হয়েছে, যাতে বাতাস ও আলো সহজে প্রবাহিত হতে পারে।
একজন স্থাপত্যবিদের মতে, “বাইতুল মোকাররমে আমরা ইসলামী স্থাপত্যের মর্ম দেখতে পাই—সরলতা, সামঞ্জস্য ও আধ্যাত্মিকতা। এখানে গম্বুজের অনুপস্থিতিও এক দার্শনিক ঘোষণা, যা বলে দেয় ইসলাম কেবল অলংকারে নয়, মনের পবিত্রতায় বড়।”
মসজিদের আশপাশে তৈরি হয়েছে বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স, যা শহুরে স্থাপত্যের সঙ্গে ধর্মীয় কাঠামোর সংযোগ ঘটিয়েছে। এর ফলে বাইতুল মোকাররম একদিকে পবিত্রতা বজায় রেখেছে, অন্যদিকে আধুনিক নগরজীবনের বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।
ধর্মীয় কার্যক্রম: নামাজ, দোয়া ও ঐক্যের প্রতীক
বাইতুল মোকাররম আজ বাংলাদেশের ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন এখানে অনুষ্ঠিত হয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, যেখানে শুধু আশপাশের মুসল্লি নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষও অংশ নেন।
জুমার নামাজে প্রায় বিশ হাজার মানুষ একত্র হন। রমজান মাসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় কয়েক গুণ বেশি। সন্ধ্যায় আজান পড়ামাত্রই গোটা এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। তারাবিহ নামাজে হাজারো মুসল্লি অংশ নেন; অনেকেই রাতভর অবস্থান করেন ইবাদতে।
রমজানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফে অংশ নেওয়া মানুষের ভিড় দেখে বোঝা যায়, এই মসজিদ দেশের ধর্মীয় অনুভূতির কেন্দ্র। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এখানে অনুষ্ঠিত হয় দোয়া মাহফিল, ওয়াজ মাহফিল, হজ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও ইসলামি বইমেলা।

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জামাতে বাইতুল মোকাররমে লাখো মানুষ একত্র হন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের শীর্ষ নেতারাও নামাজে অংশ নেন। এই মুহূর্তগুলোতে বাইতুল মোকাররম রূপ নেয় জাতীয় ঐক্যের মঞ্চে, যেখানে সমাজের সব স্তরের মানুষ মিলিত হয় এক দোয়ার ছায়ায়।
অর্থনৈতিক প্রভাব: ধর্মের পাশাপাশি এক বিশাল বাজার
বাইতুল মোকাররমের চারপাশে যে বাজার গড়ে উঠেছে, তা ঢাকার অর্থনৈতিক স্পন্দনের অন্যতম কেন্দ্র। মসজিদের নিচতলায় ও চারপাশে গড়ে ওঠা মার্কেটটি এখন রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য কেন্দ্র।
এখানে প্রতিদিন গড়ে লক্ষাধিক মানুষ কেনাকাটা করতে আসেন। পোশাক, জুতা, পারফিউম, ইসলামিক বই, হজের সামগ্রী, ইলেকট্রনিক পণ্য—সবকিছুই পাওয়া যায় এই এলাকায়। রমজান মাসে ক্রেতাদের ঢল নামে, বিশেষত ঈদের আগে।
ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “রমজান এলেই বাইতুল মোকাররম নতুন রূপ নেয়। দিন-রাত মানুষে ভরা থাকে। আমাদের ব্যবসার বড় অংশ এখান থেকেই উঠে আসে।”
এই মার্কেটের আয় থেকে একটি অংশ মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হয়। মসজিদ কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ, পানীয় জল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে তহবিল ব্যবহার করে।
শুধু অর্থনৈতিক নয়, এই মার্কেট একটি সামাজিক পরিবেশও তৈরি করেছে। এখানে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কের মধ্যেও আছে ধর্মীয় শ্রদ্ধা। অনেক দোকানদার দিন শুরু করেন দোয়া পড়ে; কেউ কেউ বিক্রির একটি অংশ নিয়মিতভাবে দান করেন মসজিদে।
একজন অর্থনীতিবিদের মতে, “বাইতুল মোকাররম ধর্মীয় অর্থনীতির এক মডেল। এখানে ধর্ম, বাণিজ্য ও নৈতিকতার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য নগরজীবনের সংস্কৃতি।”
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা: মিলনমেলা, ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের প্রতিফলন
বাইতুল মোকাররম শুধু মসজিদ নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক কেন্দ্রবিন্দু। এখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ মিলিত হন শুধু নামাজের জন্য নয়, সামাজিক যোগাযোগের জন্যও। ধর্মীয় উৎসব, দোয়া মাহফিল, সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং মানবসেবা কর্মসূচিতে এই স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
এখানে প্রতিবছর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ইসলামি বইমেলা, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রকাশক ও লেখক অংশ নেন। তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। অনেক তরুণ-তরুণী কুরআন, হাদিস, ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে এই মেলার মাধ্যমে।
সাংস্কৃতিকভাবে বাইতুল মোকাররম এক সংলগ্ন জায়গা; এখানে মানুষ শুধু ধর্ম নয়, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধও শেখে। দুর্যোগকালীন সময়ে এখান থেকে শুরু হয় ত্রাণ কার্যক্রম; করোনাকালেও এই মসজিদে নিয়মিতভাবে বিতরণ করা হয়েছে খাদ্য ও ওষুধ সহায়তা।
সামাজিক গবেষক রেজাউল করিম বলেন, “বাইতুল মোকাররম এক প্রকার সমাজের প্রতিচ্ছবি। এখানে দেখা যায় ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবতার মেলবন্ধন। আধুনিক ঢাকার ব্যস্ততার মাঝেও এই মসজিদ মানুষকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করায়।”
এক সময় বাইতুল মোকাররমে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ক্বিরাত ও হামদ-নাতের আয়োজন হতো, যা আজও অনেক তরুণের অনুপ্রেরণা। ইসলামি সঙ্গীত, বক্তৃতা ও বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও এই মসজিদ ও তার চত্বর একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে বাইতুল মোকাররম কেবল ধর্মীয় অনুশীলনের স্থান নয়, বরং এটি তাদের আত্মপরিচয়ের অংশ, যেখানে তারা নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সামাজিক মানবিকতার মূল্যবোধ শেখে।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ আজ বাংলাদেশের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের স্পন্দন। এটি এমন এক স্থান, যেখানে ইতিহাসের ছোঁয়া, স্থাপত্যের মহিমা, ধর্মীয় ঐক্য, বাণিজ্যের প্রবাহ ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য একত্রিত হয়েছে।
মক্কার কাবার প্রতিরূপে গড়া এই মসজিদ প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—ইসলাম কেবল নামাজ বা দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানবতার এক সম্পূর্ণ দর্শন।
বাইতুল মোকাররম তাই আজও দাঁড়িয়ে আছে ঢাকার হৃদয়ে—একটি স্থাপনা নয়, বরং এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে, যা প্রতিদিন মানুষকে আহ্বান জানায় ঐক্য, বিশ্বাস ও নৈতিকতার পথে।