আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরার দিন। ইসলামের ইতিহাসে এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন। এ দিনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা থাকলেও একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে এ দিনের আমল করা এবং ভিত্তিহীন ও শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা।
হাদিসে আশুরার দিনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দুটি আমলের প্রতি- রোজা রাখা এবং আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার করা। পাশাপাশি দোয়া, জিকির, কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকাসহ অন্যান্য নেক আমলেও মনোযোগ দেওয়া উচিত। একইসঙ্গে এ দিনকে ঘিরে সমাজে প্রচলিত নানা বিদআত, কুসংস্কার ও অতিরঞ্জিত আচরণ থেকেও দূরে থাকার নির্দেশনা রয়েছে।
আশুরার দিনের সর্বোত্তম আমল হলো রোজা রাখা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, আশুরার রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
সাহাবি রুবাইয়্যি বিনতে মুআউইয (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমরা আশুরার দিন রোজা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদেরও রোজা রাখাতাম। তাদের জন্য পশমের খেলনা বানিয়ে দিতাম। তারা খাবারের জন্য কাঁদলে সেই খেলনা দিয়ে ব্যস্ত রাখতাম। এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৬০)
রাসুলুল্লাহ (স.) ইহুদিদের থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে আশুরার সঙ্গে নবম তারিখেও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তাহলে ইনশাআল্লাহ নবম তারিখেও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)
এ কারণে অধিকাংশ আলেমের মতে ৯ ও ১০ মহররম একসঙ্গে দুইটি রোজা রাখা উত্তম। ৯ তারিখ রাখতে না পারলে ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়েও রোজা রাখা যায়।
মহররমকে হাদিসে ‘আল্লাহর মাস’ (شهر الله) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘রমজানের পর যদি রোজা রাখতে চাও, মহররম মাসে রাখো। এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহ তাআলা এক গোত্রের তাওবা কবুল করেছিলেন এবং তিনি আরোও অনেক গোত্রের তাওবাও এই দিনে কুবুল করবেন।’ (জামে তিরমিজি: ৭৪১)
তাই এ দিনে তওবা, ইস্তেগফার, দোয়া, জিকির, কোরআন তেলাওয়াত এবং অন্যান্য নেক আমলে নিজেকে ব্যস্ত রাখা উচিত।
আশুরার দিনে বিশেষ দান-সদকার কোনো আলাদা নির্দেশনা সহিহ হাদিসে নেই। তবে সাধারণভাবে দান-সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও অসহায়দের সহযোগিতা সব সময়ই প্রশংসনীয় আমল।
আশুরাকে স্থায়ী শোক ও মাতমের দিবস বানানো ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মতো চিৎকার করে।’ (সহিহ বুখারি: ১২৯৪; সহিহ মুসলিম: ১০৩)
কিছু স্থানে আশুরার দিন আত্মনির্যাতনকে ধর্মীয় ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে দেখানো হয়। অথচ ইসলাম তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা নিসা: ২৯)
আশুরা উপলক্ষে বিশেষ নামাজ বা নির্দিষ্ট সংখ্যার জিকির, যা শরিয়তে প্রমাণিত নয়—এমন কিছুকে ধর্মীয় ইবাদত মনে করা ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন চালু করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭)
কিছু অঞ্চলে আশুরার দিন বিশেষ খাবার বা খিচুড়ি রান্নাকে ধর্মীয় আমল মনে করা হয়। অথচ কোরআন বা সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। সাধারণভাবে মানুষকে খাবার খাওয়ানো বা দান-সদকার উদ্দেশ্যে আপ্যায়ন অবশ্যই নেক কাজ; তবে এটিকে সুন্নত, বিশেষ ফজিলতপূর্ণ বা আবশ্যক ধর্মীয় রীতি মনে করা শরিয়তসম্মত নয় এবং এর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই।
আশুরা এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ভিত্তিহীন বর্ণনা ছড়িয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (সহিহ বুখারি: ১০৭)
তাই যাচাই ছাড়া কোনো ধর্মীয় তথ্য প্রচার করা উচিত নয়।
মহররম সম্মানিত চারটি হারাম মাসের একটি। এ মাসে গুনাহ, জুলুম, গিবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতা থেকে আরও বেশি সতর্ক থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং এসব সম্মানিত মাসে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।’ (সুরা তাওবা: ৩৬)
আশুরা রোজা, তওবা, ইস্তেগফার ও আত্মশুদ্ধির এক মহামূল্যবান সুযোগ। আবেগ বা প্রচলিত রীতির অনুসরণ নয়, কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে এ দিনের আমল করাই একজন মুমিনের কর্তব্য। আশুরার প্রকৃত শিক্ষা হলো- আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং সব ধরনের বিদআত ও কুসংস্কার থেকে নিজেকে দূরে রাখা।