রাজন হোসেন তৌফিক:
সকালের আলো ফুটতেই ঠেলাগাড়িতে কেটলি কাপ নিয়ে ছোটেন সাদ্দাম। মাটির চুলায় আগুন দেন, বসিয়ে দেন বড় কেটলি। ধীরে ধীরে ফুটতে থাকে পানি, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে চায়ের সুগন্ধ। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ছায়, চা-বাগানের পাশে দাঁড়ানো এই ছোট্ট দোকানটিই এখন অনেকের প্রিয় আশ্রয়স্থল। স্থানীয়দের কাছে এটি সাদ্দামের দোকান।
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে, ভাড়াউড়া চা-বাগানসংলগ্ন শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশে দোকানটি। এক পাশে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, অন্য পাশে বিস্তীর্ণ চা-বাগান।
একসময় সবাই এটিকে চিনতেন চাচার দোকান হিসেবে। ২০০৩ সালে সাদ্দামের বাবা সবর আলী ছোট পরিসরে দোকান শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে দোকানের নাম বদলেছে, বদলেছে মালিকানা। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা কমেনি। সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে দোকান।
দিনভর এখানে চলে চায়ের আড্ডা, গল্প, হাসি-আনন্দ। দুধ চা-রং চা মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় শত কাপ বিক্রি হয়। পান, বিস্কুট, কেক, কলা - হালকা খাবারও মেলে।
নিয়মিত ক্রেতা দ্বীপ চক্রবর্তী বলেন, আমাদের দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে এই দোকান। প্রতিদিন অন্তত একবার এখানে না এলে দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগে।
বাইকার সোলেমান পাটোয়ারি বলেন, শ্রীমঙ্গলের বাইকারদের কাছে এটি পরিচিত মিলনকেন্দ্র। শহর থেকে দূরে হলেও এখানে আলাদা টান কাজ করে। সবচেয়ে ভালো লাগে, এখানে কোনো কৃত্রিম আয়োজন নেই। বিদ্যুৎ নেই, ফ্যান নেই। প্রকৃতির বাতাসই সব ঘাটতি পূরণ করে দেয়।
বাবার হাত ধরে বড় হয়েছি এই দোকানে। এখন আমি চালাই। ঢাকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক - অনেকেই এসেছেন। আমরা চেষ্টা করি সবাইকে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক বলেন পর্যটন মানচিত্রে দোকানটি বিশেষ স্থান দখল করেছে। লাউয়াছড়া বা চা-বাগান ঘুরতে এসে অনেক পর্যটক এখানে সময় কাটান। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে শান্ত পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য আমরাও আসি।
জীবন পাল নামের এক ক্রেতা বলেন, চা মুখ্য বিষয় নয়, প্রকৃতির বুকে কিছুটা সময় কাটানোই আসার প্রধান উদ্দেশ্য।
শহরের কোলাহল ছেড়ে এক কাপ চায়ের জন্য প্রকৃতির কোলে ছুটে আসা - সাদ্দামের দোকান সেই গল্পই বলে। এখানে চা শুধু পানীয় নয়, এটা আড্ডা, স্মৃতি আর প্রশান্তির নাম।