রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) স্থাপন প্রকল্প নিয়ে চ্যানেল ২৪ এ প্রকাশিত “১৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পে নয়-ছয়” শীর্ষক সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আব্দুল গফুর।
আব্দুল গফুর দাবি করেছেন, প্রকল্পের তথ্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বাস্তব চিত্র আড়াল করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তিনি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১১৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় এবং দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অথচ কিছু সংবাদমাধ্যমে “১৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প” উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী সঠিক নয়। দীর্ঘ ১৩ বছরে প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৮৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। অবশিষ্ট অর্থ এখনো ছাড় হয়নি এবং ব্যয়ও করা হয়নি। তাই “সম্পূর্ণ টাকা লোপাট” বা “নয়-ছয়” ধরনের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেন তারা।
তিনি আরও জানান, এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে চারজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম প্রকল্প পরিচালক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর মো. সেকান্দর আলী খান। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
দ্বিতীয় প্রকল্প পরিচালক হিসেবে প্রায় এক দশক দায়িত্ব পালন করেন প্রফেসর ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা। তাঁর সময়কালে ব্যয় হয় ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় করা হয়। এছাড়া প্রকল্প পরিচালকের গাড়ি ক্রয়ে ব্যয় হয় প্রায় ৭০ লাখ টাকা।
তৃতীয় প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ড. সেলিনা আখতারের দায়িত্বকালে ব্যয় হয় ৮ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
চতুর্থ প্রকল্প পরিচালক আব্দুল গফুর জানান, তাঁর দায়িত্বকালে প্রায় ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ কোটি টাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থ অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়ন, গ্যারেজ নির্মাণ, ভূমি উন্নয়ন, মাস্টার প্ল্যান, গেইট ও নেইমপ্লেট নির্মাণ, অফিস পরিচালনা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং পরিকল্পিত বনায়ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে ৬৮ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি আর্থিক বিধি অনুসরণ করেই প্রশাসনিক ও প্রকল্প-সংক্রান্ত কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অগ্রিম গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিল-ভাউচার, ট্যাক্স ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
মাস্টার প্ল্যান, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং ও বড় আকারের নকশা বাইরে থেকে প্রিন্ট করানোর বিষয়ে তিনি জানান, এসব কাজ অফিসের সাধারণ প্রিন্টার বা ফটোকপি মেশিনে সম্ভব ছিল না। এজন্য বিশেষায়িত প্রিন্টিংয়ের জন্য চট্টগ্রাম থেকে প্রিন্ট ও কপি করানো হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের গাড়িতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের অভিযোগও নাকচ করেছেন আব্দুল গফুর। তিনি বলেন, গাড়িটি শুধু প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত কাজে নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, অতিথি পরিবহন, উন্নয়নকাজ তদারকি এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক সফরে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ভাইস চ্যান্সেলরের সরকারি গাড়ি বিকল থাকায় দীর্ঘ সময় প্রকল্প পরিচালকের গাড়ি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়া শেলটেক কনসালটেন্ট ফার্ম, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত বিশেষজ্ঞদের সভা, সাইট পরিদর্শন ও কারিগরি কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আপ্যায়ন, যাতায়াত, সম্মানী ও আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, এসব ব্যয় প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যয়ের অংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট ও নেইমপ্লেট নির্মাণে কাজ শুরুর আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে দাবি করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছে এবং কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রকৌশলীদের যাচাই-বাছাই শেষে ধাপে ধাপে বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
নিজের যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে আব্দুল গফুর বলেন, তাঁর প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ২২ বছরের বেশি বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি পিপিআর, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা, আইবাস, পিএমআইএস ও ই-পিএএমআইএসসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির জন্য যথাযথ আবেদন করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণকে নিয়ে পাবলিক কনসালটেশন সভাও সম্পন্ন হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ফি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
একইসঙ্গে পরিকল্পিত বনায়ন কার্যক্রম নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে তিনি জানান, প্রতিটি চারা রোপণের ছবি, কোটেশন, বিল-ভাউচার ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। এটি একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। ডিপিপি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, হল, ক্যাফেটেরিয়া ও প্রশাসনিক ভবনে ব্যবহৃত ফার্নিচার বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে বলে দাবি করে তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সরেজমিনে যাচাইয়ের আহ্বান জানান। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য অবশ্যই বেরিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য করেছেন আব্দুল গফুর।
উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত রিজেন্ট বোর্ডের জরুরি সভায় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, আইসিটি সংক্রান্ত অপরাধ, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্নের অভিযোগে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৯ অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পরে তিনি আদালতে পিটিশন দায়ের করলে আদালত প্রথমে আট সপ্তাহের স্থিতাবস্থা দিলেও সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল বরখাস্তের আদেশ বহাল রাখেন। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল আলমকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ড. নিখিল চাকমা ও ড. আবু তালেবকে অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, চ্যানেল ২৪-এ প্রচারিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। তারা গত ২৬ মে (মঙ্গলবার) ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার দাবি জানায়। তবে এখন পর্যন্ত তদন্ত কমিটি গঠনের ব্যাপারে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।