‘যেন ভাবনায় এক মনের অসুখ’— আহমেদ হাসান সানির এই পঙক্তিটি যেন আমাদের সময়ের মানুষের মানসিক বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে জীবন ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য দৌড় প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এ দৌড়ে কারও গন্তব্য স্পষ্ট নয়, কিন্তু সবাই দৌড়াচ্ছে—অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য কিংবা অন্তত অন্যের সমান হতে পারার জন্য। আজকের বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র এ তুলনার সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও নতুন ফ্ল্যাট, কারও বিদেশ ভ্রমণ, কারও নতুন গাড়ির ছবি দেখে অন্য কেউ নিজের জীবনকে মাপতে শুরু করে। যেন নিজের সুখ-দুঃখের মানদণ্ড আর নিজের ভেতরে নেই, বরং অন্যের জীবনের আয়নায় প্রতিফলিত হয়। এ প্রবণতা মানুষের মনে তৈরি করছে এক অদৃশ্য চাপ, যা ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি, হতাশা ও অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে।
এই ‘মনের অসুখ’-এর বীজ রোপিত হয় খুব অল্প বয়স থেকেই। স্কুলে কে কত নম্বর পেল—কে প্রথম হলো এখান থেকেই প্রতিযোগিতার শুরু। ফলে শিশুদের মাঝে অজান্তেই জন্ম নেয় তুলনার অনুভূতি। এ প্রতিযোগিতা শিশুমনে চাপ সৃষ্টি করে। এ চাপ যেন ধীরে ধীরে জমে থাকা বৃষ্টির পানির মতো, যা একসময় মানসিক প্লাবনে রূপ নেয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ তুলনা আরও জটিল হয়ে ওঠে। একজন চাকরিজীবী ভাবেন—সহকর্মী ফ্ল্যাট কিনেছে, গাড়ি চালাচ্ছে, অথচ আমি এখনো পারিনি। একজন ব্যবসায়ী হতাশ হন যখন প্রত্যাশিত মুনাফা আসে না। ফলে জীবন যেন এক আয়নার ঘরে আটকে যায়, যেখানে নিজের মুখ নয়, অন্যের সাফল্যের প্রতিবিম্বই বারবার চোখে পড়ে। এ মানসিক অবস্থা অনেকটা মরুভূমিতে মরীচিকার পেছনে দৌড়ানোর মতো যতই এগোনো যায়, ততই তা দূরে সরে যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই তুলনা কি সত্যিই যৌক্তিক? বাস্তবতা হলো, প্রতিটি মানুষই একেকটি আলাদা গল্প। কারও পথ মসৃণ, কারও পথ কাঁটায় ভরা; কারও সুযোগ বেশি, কারও কম। একই মাটিতে দুটি গাছ রোপণ করলেও তাদের বৃদ্ধি একরকম হয় না, কারণ তাদের পরিবেশ, যত্ন ও সময় ভিন্ন। ঠিক তেমনি, মানুষের জীবনও স্বতন্ত্র। অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করা মানে নিজের সম্ভাবনাকেই ছোট করে দেখা। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ধর্মীয় শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান সব ধর্মই মানুষকে সংযম, কৃতজ্ঞতা ও ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা দেয়। কৃতজ্ঞতার অনুভূতি অনেকটা নদীর মতো, যা মনকে শীতল করে এবং অস্থিরতা দূর করে। যখন আমরা সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি এবং যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ হই, তখন অন্যের সাফল্য আমাদের কষ্ট দেয় না; বরং তা অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রায়ই তুলনা ও প্রতিযোগিতাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ একটি শিশুর মেধা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। কেউ লেখায় পারদর্শী, কেউ সংগীতে, কেউ প্রযুক্তিতে, আবার কেউ মানবিকতায় অনন্য। এ বৈচিত্র্যই একটি সমাজকে সমৃদ্ধ করে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুদের নিজস্ব প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা, তুলনার মাধ্যমে তাদের মনকে ভারাক্রান্ত করা নয়।
জীবনের প্রকৃত প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নিজের সঙ্গে। গতকালের আমি থেকে আজকের আমি কতটা উন্নত, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মাপকাঠি। আমি কি আজ আরও ধৈর্যশীল হতে পেরেছি? আমি কি অন্যের প্রতি একটু বেশি সহানুভূতিশীল হতে পেরেছি? একজন শিক্ষক, অভিভাবক বা কর্মী হিসেবে আমি কি আমার দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করতে পেরেছি? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই আমাদের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ধারণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা ধান চাষের মতো বীজ বপনের পর তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যায় না, কিন্তু যত্ন ও সময় দিলে একসময় সোনালি ফসল ফলবেই। তেমনি আত্মউন্নয়নও একটি ধীর ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এখানে অন্যকে হারানো নয়, বরং নিজেকে গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য।
আমরা যদি নিজের জীবনকে গ্রহণ করতে শিখি, তাহলে অনেক মানসিক অস্থিরতা দূর হয়ে যায়। নিজের অবস্থাকে মেনে নিয়ে পরিশ্রম করা এবং ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সমাধান। অতিরিক্ত তুলনা অনেকটা আগুনের মতো, যা ধীরে ধীরে ভেতরের শান্তিকে পুড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, কৃতজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস সেই আগুনের ওপর জলের মতো কাজ করে। সুখ মানে অন্যের মতো হওয়া নয়; সুখ মানে নিজের জীবনে প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া। একটি সাধারণ বিকেলের পারিবারিক সময়, একটি আন্তরিক হাসি কিংবা একজন প্রিয় মানুষের সঙ্গে এক কাপ চা, এগুলোই প্রকৃত সুখের উৎস।
তাই সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। অন্যের সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করতে হবে। নিজের সম্ভাবনাকে জানতে হবে। যে কাজ করলে আনন্দ পাওয়া যায়, সে কাজই আমাদের করা উচিত। তবেই আমরা আনন্দের সঙ্গে বাঁচতে পারব এবং জীবন ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য, ঠিক যেমন বর্ষার শেষে আকাশ পরিষ্কার হয়ে আবার নীল হয়ে ওঠে। এমন একটি সুস্থ, সহমর্মী ও আত্মসচেতন জাতি গড়ে তুলতে হলে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। কারণ, তুলনার বীজ যদি শৈশবেই বপন করা হয়, তবে তার ফল ভোগ করতে হয় পুরো জাতিকেই; আর যদি সেখানে আত্মউন্নয়ন, সহানুভূতি ও কৃতজ্ঞতার বীজ রোপণ করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মই হয়ে উঠবে মানসিকভাবে সুস্থ ও মানবিক।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, স্কুল অব বিজনেস, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়