দেশের স্বাস্থ্য খাতে চরম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। স্বাস্থ্য প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল—সবখানেই চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আতঙ্কে রয়েছেন। কোথাও রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে হামলা চালিয়ে চিকিৎসকের মাথা থেঁতলে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তার কক্ষে ঢুকে অস্ত্রের মুখে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে—এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালককেও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় দেশের স্বাস্থ্য খাতে অজানা শঙ্কা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি সারাক্ষণ শারীরিক নির্যাতন, অপমান বা হামলার আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে স্বাভাবিক ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে জেলা-উপজেলা হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ পর্যায়ে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্যসেবার পুরো ব্যবস্থাই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে চিকিৎসকদের সুরক্ষা এবং চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ মোকাবিলায় এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর আইন নেই। বর্তমানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন এবং দণ্ডবিধির কিছু সাধারণ ধারার মাধ্যমে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এসব আইনে চিকিৎসক ও রোগী—উভয় পক্ষের অধিকার ও সুরক্ষা স্পষ্ট নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, কর্মস্থলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করা সম্ভব হবে না। কারণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আতঙ্কে থেকে সঠিকভাবে রোগীসেবা ও চিকিৎসা প্রদানে ব্যর্থ হবেন। যার প্রভাব পড়বে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। তিনি বলেন, এর আগে একটি আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আইন থাকলে তার প্রয়োগ করা যেত। যেহেতু আইন নেই, তাই রোগী, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান—কোনোটির নিরাপত্তাই নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতো চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের পরিস্থিতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অন্তত তিন দফা এ-সংক্রান্ত আইনের খসড়া তৈরি ও সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে একটি খসড়া প্রাথমিক অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিকিৎসকদের সুরক্ষা নয়, চিকিৎসা অবহেলায় রোগীদের প্রতিকার পাওয়ার বিষয়টিও আইনে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। গত বছরের ১৩ মার্চ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান গণমাধ্যমে বলেছিলেন, দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন চূড়ান্ত হবে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই আইন আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. জাহিদ রায়হানকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। রাজধানীর মহাখালী এলাকায় হাসপাতালকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী তৎপরতা ও চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার পর তার কার্যালয়ে এ হুমকিপত্র পৌঁছায়। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে শনিবার রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) সহকারী পরিচালকের কক্ষে ঢুকে অস্ত্রের মুখে হুমকি দেয় স্থানীয় একদল যুবক।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আউটসোর্সিং নিয়োগে নিজেদের লোক নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে তারা এ ঘটনা ঘটায়। দুপুরের দিকে সহকারী পরিচালক ডা. রাশেদের কক্ষে ঢুকে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখানো হয়। ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েকজন যুবক সহকারী পরিচালকের কক্ষে ঢুকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে এবং অস্ত্র প্রদর্শন করে হুমকি দেয়। তারা সরাসরি বলে, তাদের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের ক্ষতি করা হবে। শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে হৃদরোগে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুক্রবার গভীর রাতে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। গুরুতর আহত চিকিৎসক নাসির ইসলামকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে।
হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার বিলাশখান এলাকার লাল মিয়া কাজী বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে স্বজনরা লিখিত অঙ্গীকার দিয়ে হাসপাতালে রেখেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে চান। কিছু সময় পর রোগীর মৃত্যু হলে চিকিৎসক দেরিতে এসেছেন—এমন অভিযোগ তুলে স্বজনরা জরুরি বিভাগে ভাঙচুর চালান। একপর্যায়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক নাসির ইসলামকে ইট দিয়ে আঘাত করে গুরুতর জখম করা হয়।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা মিতু আক্তার বলেন, আহত চিকিৎসককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং ঘটনাটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। হামলার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে গত ২০ এপ্রিল রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আহমদ হোসেনের ওপর হামলার ঘটনাও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
র্যাব জানিয়েছে, হাসপাতালের ঠিকাদারি কাজ নিয়ে বিরোধের জেরে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে তার ওপর হামলা চালানো হয়। মহাখালী এলাকায় হাঁটার সময় দুর্বৃত্তরা তাকে ছুরিকাঘাত করে। এ ঘটনায় মূল হামলাকারীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একের পর এক হামলা, হুমকি ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় চিকিৎসক সমাজের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসী প্রভাবমুক্ত রেখে দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা গেলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও বড় সংকটে পড়বে।
সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি, যা অনেকেই মেনে নিতে পারছে না। ফলে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার পেছনে মূলত টেন্ডার ও আউটসোর্সিং বাণিজ্য রয়েছে। টেন্ডারে যারা সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে, তাদের কাজ দিতে গেলে অন্য গ্রুপ সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে। আবার আউটসোর্সিংয়ের ঠিকাদাররা হাসপাতালে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এদের কথায় সব করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, এসব হুমকি দিয়ে আমাদের ভালো কাজ থামিয়ে দেওয়া যাবে না। আমি থেমে নেই। আমরা আউটসোর্সিং পদ্ধতি বাতিল করে দেব। এ ছাড়া এখন থেকে সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় সিভিল ড্রেসে র্যাব পাহারায় থাকবে।