তাওয়াফ শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছুকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করা। ইসলামি শরিয়তে তাওয়াফ বলতে পবিত্র কাবাঘরকে নির্দিষ্ট নিয়মে সাতবার প্রদক্ষিণ করাকে বোঝানো হয়। হজ ও ওমরা উভয় ইবাদতেই তাওয়াফ একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলেও এদের প্রকারভেদ, ধর্মীয় মর্যাদা এবং পালনের পদ্ধতিতে বেশ কিছু মৌলিক ও সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের আলোকে বিষয়টি নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ ‘তারা যেন প্রাচীন ঘর (কাবা) তাওয়াফ করে।’ (সুরা হজ: ২৯) এই আয়াতের ভিত্তিতেই তাওয়াফে জিয়ারাহ হজের অন্যতম ফরজ রুকন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। (বাদায়েউস সানায়ে, কিতাবুল হজ)
তাওয়াফের পর দুই রাকাত নামাজ আদায়ের বিষয়ে কোরআনে নির্দেশ এসেছে- وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ‘মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।’ (সুরা বাকারা: ১২৫)
এই আয়াতের নির্দেশনা ও হাদিস এবং ফিকহি ব্যাখ্যার ভিত্তিতে হানাফি মাজহাবে তাওয়াফ-পরবর্তী দুই রাকাত নামাজ ওয়াজিব বলা হয়েছে- হজ ও ওমরা উভয় ক্ষেত্রেই।
হজ ও ওমরার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো তাওয়াফের সংখ্যায়।
ওমরা: ওমরায় একটি তাওয়াফ রয়েছে, যাকে তাওয়াফে ওমরা বলা হয়। এটি ওমরার ফরজ রুকন। এটি ছাড়া ওমরা পূর্ণ হয় না।
হজ: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী হজে তিন ধরনের তাওয়াফ রয়েছে-
হজের তাওয়াফ: তাওয়াফে জিয়ারাহ জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সুবহে সাদিক থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের মধ্যে আদায় করা ওয়াজিব। নির্ধারিত সময়ের পর আদায় করলে হানাফিমতে দম ওয়াজিব হয়।
ওমরার তাওয়াফ: ওমরার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই; বছরের যেকোনো সময় তা আদায় করা যায়। তবে হজের নির্ধারিত দিনগুলোতে (৯–১৩ জিলহজ) ওমরা করা হানাফিমতে মাকরুহে তাহরিমি।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো- যে তাওয়াফের পর সাঈ করা হয়, কেবল সেই তাওয়াফেই রামাল (প্রথম তিন চক্করে দ্রুত হাঁটা) ও ইজতিবা (ডান কাঁধ খোলা রাখা) সুন্নত।
ওমরা: যেহেতু ওমরার তাওয়াফের পর সাঈ করা হয়, তাই এতে রামাল ও ইজতিবা সুন্নত।
হজ: হজে অবস্থাভেদে বিধান পরিবর্তিত হয়-
ওমরায় তাওয়াফের পরপরই সাঈ করা ওয়াজিব; এটি ছাড়া ওমরা পূর্ণ হয় না।
হজে তাওয়াফে জিয়ারাহ ও সাঈর মাঝে সময়ের ব্যবধান থাকতে পারে। তবে তাওয়াফে বিদার পর কোনো সাঈ নেই।
হজের ক্ষেত্রে তাওয়াফে বিদা একটি স্বতন্ত্র ওয়াজিব ইবাদত। এটি না করলে দম ওয়াজিব হয়। নবী কারিম (স.) ইরশাদ করেন- ‘কেউ যেন বায়তুল্লাহকে শেষ সাক্ষাৎ না করে চলে না যায়।’ (সহিহ মুসলিম: ১৩২৭)
ওমরায় আলাদা কোনো বিদায়ী তাওয়াফ নেই।
তাওয়াফ হলো হজ ও ওমরার প্রাণস্বরূপ ইবাদত। বাহ্যিকভাবে একই মনে হলেও হজ ও ওমরার তাওয়াফের মধ্যে বিধান, সময় এবং শর্তগত পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তাওয়াফে জিয়ারাহর নির্ধারিত সময় রক্ষা করা এবং তাওয়াফে বিদার গুরুত্ব হজের পূর্ণতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
সঠিক ফিকহি জ্ঞান অনুযায়ী ইবাদত পালন করাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। ব্যক্তিগত মাসয়ালায় যোগ্য আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
তথ্য: সুরা হজ: ২৯; সুরা বাকারা: ১২৫; বুখারি: ১৬০৪; মুসলিম: ১৩২৭; বাদায়ে, কিতাবুল হজ; রদ্দুল মুহতার: খণ্ড ২; আলমগিরি: খণ্ড ১