দীর্ঘ চার বছর ধরে লোকসানের বোঝা বয়ে বন্ধ থাকা রংপুরের একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্যামপুর চিনিকল ফের চালুর আশায় বুক বাঁধছেন শ্রমিক, কর্মচারী ও আখচাষিরা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ডিসেম্বরে বন্ধ চিনিকল পুনরায় চালুর ঘোষণায় মিল এলাকায় আবারও প্রাণ ফেরার স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আশা জাগালেও আখচাষে কৃষকদের ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
শ্যামপুর চিনিকল বন্ধ হওয়ার পর একদিকে যেমন শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েন আবার অন্যদিকে আখচাষ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেন অধিকাংশ কৃষক। সময় ও শ্রম কম লাগা এবং দ্রুত লাভজনক হওয়ায় তারা ধান, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষে ঝুঁকেছেন। ফলে মিল চালু হলেও পর্যাপ্ত আখ পাওয়া যাবে কি না এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সূত্র জানায়, টানা লোকসানের কারণে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুম থেকে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর বন্দরে অবস্থিত এই চিনিকলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন। একসময় কর্মচাঞ্চল্যে মুখর মিল প্রাঙ্গণ এখন নীরব। দাপ্তরিক কাজ চললেও নেই শ্রমিক-চাষিদের সেই চেনা কোলাহল। ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও মিল চালু করতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অবকাঠামো উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি মেরামত ও নতুন জনবল নিয়োগে সময় প্রয়োজন। ফলে কবে নাগাদ মিল চালু হবে তা এখনো অনিশ্চিত।
১৯৬৪ সালে নির্মিত শ্যামপুর সুগার মিলের আনুষ্ঠানিক মাড়াই শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর নির্মিত এই মিলের দৈনিক আখ মাড়াই সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ১৬ টন এবং বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ টন। বছরে মাত্র তিন মাস মেশিন চালু থাকত। শুরুতে লাভজনক থাকলেও ২০০০ সালের পর থেকে টানা লোকসানের মুখে পড়ে মিলটি। ব্যাংক ঋণ, সুদ ও শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতে লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০৫ কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতিতে তৎকালীন শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশে মিলের মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। যদিও শ্রমিক-কর্মচারী ও আখচাষিরা লোকসানের দায় ব্যবস্থাপনার দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার ওপর চাপিয়ে মিল চালুর দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।
চিনিকল অ্যামপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান বলেন, "শ্যামপুর চিনিকল ঘিরে কয়েক হাজার পরিবারের জীবিকা ছিল। মিল বন্ধের পর স্থায়ী কর্মচারীরা বদলি হলেও বেশির ভাগ অস্থায়ী কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন। সরকার পুনরায় চালুর ঘোষণা দেওয়ায় আমরা আবার আশায় বুক বেঁধেছি।"
মিল সূত্রে জানা যায়, চালু থাকাকালে এখানে ৪৯৩ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে মাত্র ৭২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের গত জুন-জুলাই ও চলতি আগস্ট মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে যার পরিমাণ প্রায় ৭০ লাখ টাকা।
বদরগঞ্জের আখচাষি মনিরুল ইসলাম বলেন, "আখের চেয়ে ধান বা সবজি চাষে লাভ বেশি ও সময় কম লাগে। মিল চালু হলেও চাষিরা ফিরবেন কি না তা ভাবতে হবে। এজন্য সরকারিভাবে প্রণোদনা দরকার।"
স্থানীয় ব্যবসায়ী নাজমুল ইসলাম বলেন, "শ্যামপুর চিনিকল ছিল এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ। দ্রুত চালু হলে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আবার গতি পাবে।"
মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন জানান, সরকারিভাবে মিল চালুর ঘোষণার পর কর্মপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অর্থ ছাড় হলেই কার্যক্রম শুরু হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ছয়টি বন্ধ চিনিকল পুনরায় চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে রংপুরের শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকল, দ্বিতীয় পর্যায়ে পঞ্চগড় ও পাবনা এবং তৃতীয় পর্যায়ে কুষ্টিয়া ও রংপুর চিনিকল চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
লিখেছেন, হাজিম উল হক
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর