
মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা যে ভয়াবহ অপরাধটি সংঘটিত করেছিল, তা বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে আছে—বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ। ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পিতভাবে দেশের খ্যাতনামা লেখক, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের তালিকা ধরে ধরে অপহরণ করা হয়। চোখ বেঁধে নিজ নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় নির্ভীক কলমযোদ্ধাদের। কয়েকদিন পর রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমিতে মিলেছে তাঁদের নিথর দেহ।
১৪ ডিসেম্বর তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি জাতির বিবেক হারানোর বেদনায় মোড়া দিন। বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তে শত্রুরা বুঝেছিল—স্বাধীন বাংলাদেশকে দুর্বল করতে হলে অস্ত্রের পাশাপাশি ধ্বংস করতে হবে চিন্তা, চেতনা ও সত্যের কণ্ঠ। শিক্ষকের খড়ির সঙ্গে সাংবাদিকের কলমও স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল তারা।
রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পাওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে একমাত্র নারী শহীদ ছিলেন কবি ও সাংবাদিক সেলিনা পারভীন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সাহিত্য পত্রিকা শিলালিপি–র সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। কাজ করেছেন সাপ্তাহিক ললনা পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগে এবং লিখেছেন বেগম, আজাদ, সংবাদ, ইত্তেফাক, পূর্বদেশ ও দৈনিক পাকিস্তান–এ। যুদ্ধের বিভীষিকায়ও লেখালেখিই ছিল তাঁর প্রতিবাদ ও সাহসের ভাষা।
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর কারফিউ–বিধ্বস্ত ঢাকায় সিদ্ধেশ্বরীর বাসার ছাদে বসে লিখছিলেন সেলিনা পারভীন। হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস ও একটি লরি এসে থামে। মুখ ঢাকা কয়েকজন আলবদর সদস্য গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নির্ভয়ে নিজের নাম বলেন। তুলে নেওয়ার সময় ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, “মামার সঙ্গে খেয়ে নিয়ো সুমন, আমি এখনই ফিরে আসছি।” সেই ফিরে আসা আর হয়নি।
স্বাধীনতার চারদিন পর রায়েরবাজারের গণকবর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চোখ ও পেটে বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন ছিল স্পষ্ট। সেদিনই আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়—একজন নারী সাংবাদিকের রক্তে লেখা হয়ে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস।
সেলিনা পারভীন একা নন। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের তথ্যমতে, শহীদ সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাক–এর নির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, সংবাদ–এর সহযোগী সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, পূর্বদেশ–এর বার্তা সম্পাদক নিজাম উদ্দিন আহমদ, সহকারী সম্পাদক আ ন ম গোলাম মোস্তফা, সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব, ক্রীড়া সাংবাদিক এস এ মান্নান, মর্নিং নিউজ–এর আবুল বাশার চৌধুরী ও সাব–এডিটর চিশতী শাহ আহমদ হোসেন। ২৫ মার্চ রাতে দৈনিক সংবাদ অফিসে অগ্নিসংযোগে নিহত হন সহকারী সম্পাদক শহীদ সাবের। ঢাকার বাইরে টাঙ্গাইল প্রতিনিধি শিবসদন চক্রবর্তী ও ঝিনাইদহের সাংবাদিক শেখ আব্দুল মান্নানও শহীদ হন।
অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকেই হয়েছেন কারাবন্দি ও নির্যাতিত। এসবই প্রমাণ করে—সাংবাদিকরা কেবল সংবাদ পরিবেশক ছিলেন না; শোষণ ও মিথ্যার বিরুদ্ধে কলমকেই তারা বানিয়েছিলেন সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।
একাত্তরের সেই কলমযোদ্ধারা আজও আমাদের পথ দেখান। তাদের রক্তে লেখা ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যকে হত্যা করা যায় না, আর কলম কখনো পরাজিত হয় না।
সিএনআই/২৫