বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে থাকা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন নাটকীয় উত্থান-পতনে ভরপুর। ভারতের নির্বাসনে থাকাকালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়া থেকে শুরু করে দেশটির ‘দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা নারী সরকারপ্রধান’ পর্যন্ত যাত্রা—হাসিনার রাজনৈতিক পথচলা ছিল নানা মোড়ে আলোচিত ও বিতর্কিত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে তিনি কখনো দলীয় প্রধান, কখনো বিরোধীদলীয় নেতা, আবার কখনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে এসেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শেখ হাসিনার নাম এড়ানো অসম্ভব।
সমালোচকদের দাবি, দলের শীর্ষ নেতৃত্বে ৪৪ বছর ধরে থাকা শেখ হাসিনার সর্বশেষ শাসনামলে নেওয়া নানা সিদ্ধান্তই আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে সংকটে ফেলেছে। এমনকি দলটির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবিও তুলেছেন বিরোধীরা।
দলীয় নেতৃত্বে আসার পথ
১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বাঁচেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এর পর কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ভারতের নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। দেশে ফেরার পর তিনি দ্রুত দলীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন।
আন্দোলন, নির্বাচন ও প্রথম ক্ষমতায় অধিষ্ঠান
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন শেখ হাসিনা। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি দেশে প্রথম নারী বিরোধীদলীয় নেত্রী হন। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন এবং সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
২০০১ সালে পরাজয়ের পর বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় আহত হলেও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যান। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় ‘মাইনাস টু’ আলোচনার মধ্যেই এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রথমবারের মতো জেলে যান।
টানা সাড়ে ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। ক্ষমতায় থাকার সময়ে বিডিআর বিদ্রোহ, যুদ্ধাপরাধের বিচার, হেফাজত আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা আলোচিত ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক আন্দোলন সহিংসভাবে দমন করার অভিযোগ ওঠে।
২০২৪ সালের দ্বিতীয় দফা কোটাবিরোধী আন্দোলন দমনেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ৮৪৪ জন হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে সংখ্যা আরও বেশি বলা হয়। পরিস্থিতি তীব্র হলে আন্দোলন সরকারবিরোধী রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একতরফা ভোট, আগের রাতে ব্যালট ভর্তি এবং ডামি প্রার্থী দাঁড় করানোর অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে গুম-খুন, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও বারবার উঠে এসেছে।
তবে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রশংসাও পান তিনি। আবার এসব প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগও ছিল।
হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ?
মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় পাওয়ায় শেখ হাসিনার রাজনীতিতে ফেরা সম্ভব কি না—এ প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন ক্ষমতাসীনদের ভূমিকার ওপরই নির্ভর করছে তার ফেরার সম্ভাবনা।
তার মতে, ভবিষ্যতের সরকার যদি ‘হাসিনার চেয়ে খারাপ’ বা ‘একই ধরনের’ শাসন পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাহলে হাসিনার ফিরে আসার একটি পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
সিএনআই/২৫
