কুমিল্লার তিতাসে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এক পক্ষ প্রতিবেশীদের ফাঁসাতে ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেটের (এমসি) সাহায্যে মামলা করে। তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) হিসেবে দায়িত্বে থাকা তিতাস থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কাওসার ওই নকল মেডিকেল সার্টিফিকেট আদালতে জমা দেন। এতে নিরপরাধ আসামিদের একজন ইমার আলী প্রায় চার মাস কারাগারে কাটান।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। মো. লিটন নামে এক ব্যক্তি প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে তিতাস থানায় মামলা করেন (এফআইআর নং–১৩/২০২৪)। তিনি অভিযোগ করেন, আসামিরা তাকে লাঠি, রড ও পাইপ দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে। আদালত বাদীর মেডিকেল সার্টিফিকেট তলব করলে তদন্ত কর্মকর্তা ঢামেক হাসপাতালের চারটি এমসি জমা দেন। এই প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেন।
তবে পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, চারটি মেডিকেল সার্টিফিকেটই জাল। ঢামেক কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে নিশ্চিত করেছে, এগুলোর কোনোটি হাসপাতাল থেকে ইস্যু করা হয়নি এবং যেসব চিকিৎসকের নামে সনদ দেওয়া হয়েছে, তাদের কেউই ঢামেকে কর্মরত নন। হাসপাতালের চিঠিতে বলা হয়, ‘উল্লিখিত জখমি সনদগুলো অত্র হাসপাতাল থেকে ইস্যু করা হয়নি।’
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন, যা ন্যায়বিচার ব্যাহত করার শামিল। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ বলেন, “একজন তদন্ত কর্মকর্তা যদি আদালতে ভুয়া প্রমাণ পেশ করেন, তা গুরুতর অপরাধ। বিভাগীয় ও বিচারিক উভয় ব্যবস্থাই তার বিরুদ্ধে নেওয়া উচিত।”
ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেছে, এসআই কাওসার বাদীপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ভুয়া এমসি সংগ্রহ করেছেন। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি ডাকযোগে সার্টিফিকেট পেয়েছি, যাচাইয়ের প্রয়োজন মনে করিনি।”
পরবর্তীতে লিটনের চাচাতো ভাই সাকিব আহমেদ একই ধরনের অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন, যেখানে আগের আসামিদের পাঁচজনকেই পুনরায় অভিযুক্ত করা হয়। দুটি মামলারই তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন একই ব্যক্তি।
কালবেলার অনুসন্ধানে জানা যায়, এজাহারে বর্ণিত হামলার ঘটনা ঘটেনি। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণেও প্রমাণ মিলেছে, অভিযুক্তরা ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ঢামেক হাসপাতালের রেজিস্টারেও ওই তারিখে বাদীপক্ষের ভর্তি হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমান তিতাস থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদ সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, “বিষয়টি নিয়ে আদালত থেকে নির্দেশ আসায় পুনঃতদন্ত চলছে।” তদন্ত কর্মকর্তা মো. মফিজ উদ্দিন বলেন, “ঢামেকে গিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনায় ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট আদালতে জমা দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার ‘অসততা ও অবহেলা’ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে অন্য কর্মকর্তারাও একইভাবে আদালতকে বিভ্রান্ত করার সাহস পাবে।
সিএনআই/২৫