চাঁদপুরের হরিণা ফেরিঘাট এলাকায় মেঘনা নদীতে থেমে থাকা একটি সারবাহী জাহাজে সাত খুনের ঘটনাকে “ডাকাতি” হিসেবে দেখছে না পুলিশ। তারা বলছেন, শুধু লুটপাটের জন্য গলা কেটে একসঙ্গে এতগুলো মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা অস্বাভাবিক।
সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান চাঁদপুর নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রাথমিক তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এর পেছনে ভিন্ন কোনো কারণ থাকতে পারে। সারসহ কোনো কিছু খোয়া না যাওয়ায় কিছুটা রহস্য তৈরি হয়েছে এ ঘটনায়।
এ প্রসঙ্গে চাঁদপুর নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান অনলাইন সংবাদমাধ্যম বলেন, “এটি প্রাথমিকভাবে ডাকাতি বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, ডাকাতি হলে তো মালামাল নিয়ে যেত। কিন্তু কোনো কিছু খোয়া যায়নি। এমনকি যারা খুন হয়েছেন, তাদের মোবাইল ও মানিব্যাগও পাওয়া গেছে।”
তিনি বলেন, “যারা কর্মচারী তারা দরিদ্র মানুষ। তাদের কাছে খুব বেশি টাকা-পয়সা থাকার কথা না। জাহাজের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হচ্ছে সার। সেই সার যেভাবে ছিল, সেভাবেই আছে। অনেক সময় জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, সেটিও ঘটেনি। জাহাজের তো অনেক দাম।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রতিটি কক্ষে কক্ষে ঢুকে প্রত্যেককে মাথায় ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। কারো গলা কেটেছে। সাধারণ ডাকাত হলে তো, মালামাল নিয়ে চলে যেত।”
কী কারণে এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে জানতে চাইলে তিনি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, “হতে পারে, যে আগে থেকে কোনো শত্রুতা ছিল, সেই শত্রুতাবশত এই ঘটনা ঘটেছে। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বও হতে পারে। তবে, যাই কিছু হোক, তদন্ত করে প্রকৃত বিষয় জানা যাবে। তার আগে, সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে, এটা ডাকাতি মনে হচ্ছে না।”
লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল জানিয়েছে, ১৯ ডিসেম্বর আল-বাখেরা নামের জাহাজটি ইউরিয়া সার পরিবহনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৮০০ মেট্রিক টন। জাহাজটির পণ্য পরিবহন ঠিকাদার মেসার্স হামিদিয়া এন্টারপ্রাইজ। বরাদ্দ পাওয়ার পর জাহাজটিতে ২১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর কাফকো জেটি থেকে ৭২০ টন ইউরিয়া সার বোঝাই করা হয়। রবিবার ভোরে জাহাজটি সার নিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হয়। এই সার ছিল বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি)।
জাহাজটিতে বহন করা পণ্যের এজেন্ট হামিদিয়া এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক (পরিচালন) পারভেজ হোসাইন জানিয়েছেন, জাহাজ গন্তব্যে রওনা হওয়ার পর তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। সকাল থেকে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় মূলত “মুগনি-৩” জাহাজের নাবিকরা এমভি আল-বাখেরার কাছাকাছি গিয়ে ঘটনা জানতে পারেন।
চাঁদপুরে জাহাজে ৭ জন নিহতের ঘটনায় যা জানা গেলচাঁদপুরে জাহাজে ৭ জন নিহতের ঘটনায় যা জানা গেল
সোমবার বিকেলে হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় মেঘনা নদীতে আল বাখেরা জাহাজ থেকে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় গুরুতর আহত আরও ৩ জনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুইজনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতরা হলেন- জাহাজের মাস্টার কিবরিয়া, ইঞ্জিন চালক সালাউদ্দিন, সুকানি আমিনুল মুন্সি, গ্রিজার সজিবুল, আজিজুল ও মাজেদুল ইসলাম। একজনের নাম জানা যায়নি।
গুরুতর অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাতে অ্যাম্বুলেন্সে করে জুয়েল রানা (২৩) নামে এক সুকানিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তার শ্বাসনালী কেটে গেছে। তিনি শঙ্কামুক্ত নন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার মুশফিকুর রহমান বলেন, “জুয়েলের কাছ থেকে কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। যেহেতু তার শ্বাসনালী কেটে গেছে ফলে তিনি কথা বলতে পারছেন না। তবে তিনি কাগজে নিজের নাম এবং জাহাজে তারা আটজন ছিলেন সেটা লিখে পুলিশকে জানিয়েছেন।”
……