
আধুনিক সভ্যতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ মিশে আছে প্লাস্টিক। সকালে ঘুম থেকে উঠে টুথব্রাশ ব্যবহার করা থেকে শুরু করে রাতে প্লাস্টিকের সুইচ টিপে বাতি নেভানো পর্যন্ত—আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ প্লাস্টিকনির্ভর। কিন্তু এই আশীর্বাদই আজ মানবজাতির জন্য এক ভয়ংকর অভিশাপে পরিণত হয়েছে। আজ প্লাস্টিক অতি ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে আমাদের নিশ্বাসে, খাবারে এবং সরাসরি রক্তে মিশে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা একে নাম দিয়েছেন মাইক্রোপ্লাস্টিক।
হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্টের চূড়া থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রের তলদেশ, এমনকি জনমানবহীন অ্যান্টার্কটিকার তুষারেও আজ থাবা বসিয়েছে এই বিষাক্ত কণা। সম্প্রতি এক বৈশ্বিক পর্যালোচনায় প্রায় ৭,০০০টি গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এক সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি মানবদেহের জন্য এক অদৃশ্য ঘাতক।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী? এবং এর গঠন প্রক্রিয়া:
সহজ কথায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের এমন সব কণা যার আকার ৫ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট। এর চেয়েও ক্ষুদ্র কণাগুলোকে বলা হয় ন্যানোপ্লাস্টিক। সাধারণত এটি ১ মাইক্রোমিটারের কম এবং খালি চোখে দেখা অসম্ভব। ন্যানোপ্লাস্টিকগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে এগুলো মানুষের কোষের দেয়াল এবং রক্তের সুরক্ষা দেয়াল ভেদ করে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে।
উৎপত্তি অনুযায়ী মাইক্রোপ্লাস্টিককে দুই ভাগে ভাগ করা হয় প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি ক্ষুদ্র আকারেই তৈরি করা হয়। যেমন: ফেসওয়াশ, সাবান বা টুথপেস্টে ব্যবহৃত মাইক্রোবিডস। এছাড়া কলকারখানায় প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পেলেটও এই তালিকায় পড়ে। সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত বড় আকারের প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে তৈরি হয়। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ বা মাছ ধরার জাল যখন রোদের তাপ, ঢেউ বা বাতাসের সংস্পর্শে এসে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, তখন সেগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিকের রূপ নেয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস যেখান থেকে এসেছে:
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় প্রতিটি পণ্যই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা এর প্রধান কিছু উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো, সিনথেটিক কাপড় অর্থাৎ আমরা যখন পলিয়েস্টার, নাইলন বা এক্রাইলিক জাতীয় কাপড় ধুই, তখন প্রতিটি ওয়াশ সাইকেলে হাজার হাজার ক্ষুদ্র প্লাস্টিক তন্তু (microfibers) পানির সাথে মিশে যায়। টায়ারের ক্ষয়, গাড়ি চলার সময় রাস্তার সাথে টায়ারের যে ঘর্ষণ হয়, তা থেকে বিপুল পরিমাণ রাবার ও প্লাস্টিক কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে যা বৃষ্টির পানির সাথে জলাশয়ে গিয়ে মেশে। প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বোতল থেকে সরাসরি পানি পানের সময় প্লাস্টিকের কণা পানিতে মিশে যায়। এছাড়া পলিথিন ব্যাগ পরিবেশের সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে জারিত হয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি করে। প্রসাধনী ও কৃষিকাজ, স্ক্রাব বা ক্লিনজারে থাকা প্লাস্টিক দানা সরাসরি পয়ঃনিষ্কাশন নালায় যায়। অন্যদিকে, কৃষিতে ব্যবহৃত প্লাস্টিক মালচিং ফিল্ম মাটির উর্বরতা নষ্ট করে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ায়।
যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছি আমরা:
আমরা প্রতিনিয়ত তিনভাবে এই বিষাক্ত কণা গ্রহণ করছি যা আমাদের শরীরকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিচ্ছে।
ক) খাবারের মাধ্যমে:
নদী ও সমুদ্রের প্লাস্টিক বর্জ্য সামুদ্রিক প্রাণীরা খাবার মনে করে খেয়ে ফেলে। তুরস্কের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক মাছের পাকস্থলীতে তন্তুর ব্যাপক আধিক্য রয়েছে। সেই মাছ যখন আমরা খাই, তখন সেই প্লাস্টিক আমাদের পাকস্থলীতে প্রবেশ করে। এছাড়া খাবার লবণ, মধু, চিনি এবং এমনকি বিয়ারেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
খ) পানির মাধ্যমে:
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, কলের পানির তুলনায় বোতলজাত পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানিতে ট্যাপের পানির চেয়ে তিনগুণ বেশি ন্যানোপ্লাস্টিক থাকে, যা মূলত প্লাস্টিক প্যাকেজিং থেকেই আসে।
গ) বাতাসের মাধ্যমে:
আমরা প্রতি মুহূর্তে যে বাতাস নিচ্ছি, তাতেও রয়েছে প্লাস্টিক। শহরাঞ্চলের বাড়ির ছাদে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রতি বর্গমিটারে ২৯ থেকে ২৮০টি প্লাস্টিক কণা আকাশ থেকে ঝরে পড়ে। সিনথেটিক কার্পেট বা পোশাকের তন্তু এবং টায়ারের ধুলাবালি নিশ্বাসের সাথে আমাদের ফুসফুসে স্থায়ীভাবে জমা হচ্ছে।
শরীরের ভেতর প্লাস্টিকের তাণ্ডব:
মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশই করছে না, বরং এটি আমাদের রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৮০% সুস্থ মানুষের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান রয়েছে।
ক) হৃদরোগ ও রক্তনালীর সমস্যা:
চিকিৎসা সাময়িকী সার্কুলেশন (Circulation)-এর তথ্যমতে, হৃদরোগীদের রক্তনালীর প্লাকে (plaque) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলে তাদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪.৫ গুণ বেড়ে যায়। এটি রক্তনালীতে প্রদাহ তৈরি করে যা দীর্ঘমেয়াদে প্রাণঘাতী হতে পারে।
খ) ক্যান্সার ও হরমোনের পরিবর্তন:
প্লাস্টিক কণা কোষের ভেতর গিয়ে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে এবং কোষের জেনেটিক তথ্যের ক্ষতি (genotoxicity) করে, যা শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারের দিকে নিয়ে যায়। এছাড়া এটি শরীরের অন্তঃস্রাবী গ্রন্থি বা হরমোন সিস্টেমে ব্যাঘাত ঘটায়, যা প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং ওজন বৃদ্ধির কারণ হয়।
গ) শিশুস্বাস্থ্য ও গর্ভাবস্থা:
এটি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন মায়ের প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর শরীরেও পৌঁছে যাচ্ছে। এমনকি মায়ের বুকের দুধেও এই কণা পাওয়া গেছে। প্লাস্টিকের বোতলে দুধ খাওয়া শিশুরা প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: আমাদের বিপদ কতটুকু?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাইক্রোপ্লাস্টিক সমস্যা এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। ঢাকা শহরের বিশাল প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আমাদের এই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বুড়িগঙ্গার মতো নদীগুলো আজ মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাজারে পলিথিন ব্যাগের অবাধ ব্যবহার এবং খোলা ডাস্টবিনের কারণে এই কণাগুলো বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের বিশাল পোশাকশিল্প থেকে নির্গত সিনথেটিক বর্জ্য বা ঝুট সরাসরি জলাশয়ে মিশে গিয়ে ইলিশ মাছসহ আমাদের সকল প্রিয় মাছকে বিষাক্ত করে তুলছে। আমরা যখন সেই মাছ খাই, তখন আমরা প্লাস্টিকও গ্রহণ করছি।
রাজধানীর একটি হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. আসাদ জানান, “আগের চেয়ে এখন অকাল হৃদরোগ এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা বাহ্যিক কোনো কারণ খুঁজে পাই না। কিন্তু বৈশ্বিক গবেষণার দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের অজান্তেই আমাদের শরীরের ভেতর প্লাস্টিক কণা বাসা বেঁধেছে। এটি একটি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়।”
বুড়িগঙ্গার এক জেলের কথাতেও একই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “নদীতে এখন মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের দানা বেশি। মাছের পেট কাটলে ভেতর থেকে ছোট ছোট প্লাস্টিক বের হয়। আমরা এই মাছই বাজারে বিক্রি করি, এই মাছই আমরা নিজেরা খাই।”
বাঁচার উপায় কী?
১. এই নীরব আগ্রাসন বন্ধ করতে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
২. পানির বোতল, কফি কাপ বা স্ট্র-এর মতো একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিককে না বলতে হবে। এর বদলে কাঁচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা নিরাপদ।
৩. সিনথেটিক বা কৃত্রিম সুতার পোশাকের বদলে সুতি বা পাটের তৈরি কাপড় ব্যবহার করতে হবে।
৪. প্লাস্টিক পেলেট উৎপাদন ও পরিবহনে কঠোর নিয়ম দরকার যেমনটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি চালু করেছে।
৫. প্লাস্টিক চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক উৎপাদন কমাতে হবে। ৬. বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে যাতে তা পরিবেশের সাথে মিশে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে না পারে।
পরিশেষে, প্লাস্টিক আমাদের জীবনকে সহজ করেছে সত্য, কিন্তু সেই সুবিধার বিনিময়ে আমরা আমাদের শরীর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিষাক্ত করে তুলছি। ন্যানোপ্লাস্টিক যেভাবে শরীরের জৈবিক বাধাগুলো অতিক্রম করছে, তা আগামী দিনের জন্য এক বিশাল অশনি সংকেত। আমাদের নিশ্বাসের প্রতিটি প্রশ্বাসে যদি প্লাস্টিক থাকে, তবে সেই সভ্যতা টেকসই হতে পারে না। সময় এসেছে সচেতন হওয়ার। পরিবেশের ক্ষতি মানেই দিনশেষে নিজের জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি করা। আমরা যদি আজ প্লাস্টিকের এই আগ্রাসন না থামাই, তবে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের রক্তে লোহিত কণিকার চেয়ে প্লাস্টিক কণার সংখ্যা বেশি হবে—যা হবে মানবজাতির চূড়ান্ত পরাজয়।
আনিকা বুশরা
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর