
ফিড ও বাচ্চার বাজারে নজরদারির অভাব, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের পোলট্রি খামারিরা চরম সংকটে পড়েছেন। খরচ সামাল দিতে না পেরে অনেকে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ডিম ও মুরগির বাজারেও অস্থিরতা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে নতুন করে সব ধরনের ফিডের দাম বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে এক দিনের বাচ্চার দাম অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। কখনো বাচ্চার সংকটও তৈরি করা হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খামারগুলোতে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামারি তাদের খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং হিমাগারে ডিম মজুতের প্রবণতা। এতে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় টানা লোকসানের মুখে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন নবাবগঞ্জের সোল্লা ইউনিয়নের আওনা বাজার গ্রামের ‘অরগানিক এগ্রো’র কর্ণধার মিরাজুল হাসান ভূঁইয়া। তিনি কালবেলাকে জানান, দৈনিক ২৫ হাজার পিস ডিম উৎপাদনে সক্ষম তার পাঁচটি শেডই এখন বন্ধ রয়েছে।
মিরাজুল বলেন, ‘এখন আর আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নেই। বাজারে বেশি দামে বিক্রি হলেও খামার পর্যায়ে প্রতি পিস ডিমের বিক্রয়মূল্য ও উৎপাদন খরচের ব্যবধান এক টাকা ছাড়িয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অতীতেও মধ্যস্বত্বভোগীরা ছিল। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে তাদের দৌরাত্ম্য অনেক বেড়েছে। উৎপাদন খরচের ভিত্তিতে নয়, সিন্ডিকেটের নির্ধারিত দামে ডিম কেনাবেচা করতে হয়। আমাদের অনেক সময় লোকসানে পড়তে হয়। এর মধ্যে উৎপাদনের সবচেয়ে বড় খরচ ফিডের দাম হু হু করে বাড়ছে। ফলে খরচ আর কুলিয়ে উঠতে পারছি না।’
ফিডের দাম ও বাচ্চার বাজারের কারসাজির কাছে হার মেনেছেন তরুণ খামারি কাওসার আহমেদও। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় পাঁচটি এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নে ১৩টি শেড বন্ধ করে দিতে হয়েছে তাকে।
কাওসার বলেন, ‘খামারের প্রধান খরচ খাবারের দাম অনেক বেড়েছে। আবার এক দিনের বাচ্চার বাজারেও অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ে-কমে। তার ওপর মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য দাম পাই না। এগুলোর সঙ্গে আর পারছি না। ২০০৬ সাল থেকে খামার করি, এখন তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।’
এক সময় সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের ডিম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, কারসাজির কারণে গত রোজা ও ঈদের বাজারে মুরগির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ওই সময় সোনালি মুরগির দাম রেকর্ড ৪৫০ টাকায় পৌঁছায় এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। পরে দাম কিছুটা কমলেও বর্তমানে ব্রয়লার ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ডিমের বাজারেও নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে ফার্মের বাদামি ডিমের ডজন ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ দামে ডিম কিনে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্তরাও ডিম খাওয়া কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।
খামারি ও বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোলট্রি খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সিন্ডিকেট, অনিয়ম এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই বাজারে বারবার অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, ‘ফিডের দাম অনেক বেড়েছে। এক দিনের বাচ্চার বাজারও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। কখনও ৪৫ টাকা পিস, কখনও ৭৫ টাকা। যেমন গত রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে দুই মাস আগে বাচ্চার পিস ৭৮ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অনেক সময় বেশি দামেও সাধারণ খামারিরা বাচ্চা পান না।’
তিনি আরও বলেন, ‘উৎপাদন মূল্য অনুযায়ী বাজার চলছে না। মোবাইল ফোনের বার্তায় একটি চক্র প্রতিদিন যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, সে দামে বাচ্চা, ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে হয়। সেই সঙ্গে এখন আবার হিমাগারে ডিমের মজুতও হচ্ছে। সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়। পরে মজুতকৃত ডিম বাজারে ছাড়া হয়। এসব কারণে বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় আর ছোট খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে উৎপাদনে এর বড় প্রভাব পড়বে।’
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বাজারে বেশি দামে বিক্রি হলেও খামারিরা উপকৃত হন না। অনেকে ন্যায্য দামটাও পান না। বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতি থাকায় এ খাতে নানা অনিয়ম চলছে। এখন যেমন ডিমের দাম এক মাসে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত হাত বদলে দাম বাড়াচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। চলছে অবৈধ মজুত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ খাতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য অনেক। তারা একই সঙ্গে ফিড ও বাচ্চার উৎপাদক। আবার কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে নির্ধারিত দামে তাদের কাছেই পণ্য বিক্রি করতে হয় চুক্তিবদ্ধ খামারিদের। যারা স্বাধীন খামারি তাদের সবকিছু বেশি দামে কিনতে হয়। এসব অনিয়ম বন্ধে কারও কোনো তাগিদ নেই। ফিড ও বাচ্চার দামের যৌক্তিকতা যাচাই হয় না। বাজারে ডিম-মুরগির দাম যৌক্তিক কি না খতিয়ে দেখা হয় না। বাজারে প্রতিযোগিতারও ঘাটতি রয়েছে। এ জন্য আইন থাকলেও প্রয়োগ দেখা যায় না।’
ফিডের বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের খাবারের দাম বেড়েছে। রাজধানীর ফুলবাড়িয়ার আনন্দবাজারের ফিড বিক্রেতারা জানান, গত পাঁচ বছরে ফিডের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। গত মাসেও এক দফা দাম বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগির ফিডের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
ফিড ব্যবসায়ী মো. শিহাব জানান, গত মাসে ব্র্যান্ডের ব্রয়লার গ্রোয়ার ফিডের ৫০ কেজির বস্তা ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। পাঁচ বছর আগে একই বস্তার দাম ছিল ১ হাজার ৬৫০ টাকা। সোনালি মুরগি ও ডিমের মুরগির খাবারের দামও বেড়েছে।
মদিনা পোলট্রি ফিডের মালিক মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘প্রথমে বড় ব্র্যান্ডগুলো দাম বাড়ায়। পরে অন্যরাও বাড়িয়ে দেয়। মাস দেড়েকের ব্যবধানে ব্র্যান্ডের সয়ামিলের কেজি ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬২ টাকা হয়েছে। ভুট্টার কেজি ২৬ থেকে ৩২ টাকা এবং গমের কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈল ৩৭ থেকে ৪০ টাকা হওয়ার পরও কোম্পানি এখন সরবরাহ করছে না। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম ফসফেটের কেজি ৯০ থেকে বেড়ে ১২০ টাকা, লাইম স্টোন ৮ টাকা থেকে ১৫ টাকা এবং ঝিনুক চূর্ণের কেজি ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’
ফিড প্রস্তুতকারকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারেও প্রভাব পড়েছে। ফিড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ারুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ফিড তৈরির কাঁচামালের দাম ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে মাস খানেক আগে আমাদেরও মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত না হলে সংকট বাড়বে। তাছাড়া এ খাতে করপোরেট কর, অগ্রিম আয়কর ও টার্নওভার করের বাড়তি চাপ রয়েছে। এ দিকগুলোতে সরকারের সুদৃষ্টি দিতে হবে। কারণ করের বোঝা বাড়লে তা উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলে।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যালু চেইন বড় হওয়ায় তারা নানা উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্র খামারিরা লোকসানের মুখে ঝরে পড়েন। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, সেখানে পোলট্রি পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় পোলট্রি খাত এবং খামারিরা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘খাবারের দাম কমানোর কৌশল প্রয়োজন। খাদ্যের কাঁচামাল যেহেতু অনেকাংশে আমদানিনির্ভর, তাই এ খাতে আয়কর ও শুল্কের চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতেও শুল্ক ছাড় দেওয়া যেতে পারে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ছোট খামারিদের প্রসেসরদের সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের মাধ্যমে একটি মডেল তৈরি করা যেতে পারে।’
এক দিনের বাচ্চার বাজারে অনিয়ম ঠেকাতে আইন প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি। ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, “বাচ্চার বাজারেও রাতারাতি দাম ওঠানামা করে। এটি নিয়ন্ত্রণে আমাদের কোনো আইন নেই। যেটাকে আমরা ‘হ্যাচারি অ্যাক্ট’ বলি। ফলে হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বাচ্চা প্রস্তুত করে এবং বাজারে তাদের আধিপত্য তৈরি হয়েছে। পোলট্রি খাতে দাদন ব্যবসাও চলে। হ্যাচারির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ খামারিরা কম মূল্যে বাচ্চা পান। অপরদিকে অন্য খামারিদের বেশি মূল্যে কিনতে হয় বা বাচ্চা পান না। এই অনিয়ম বন্ধে নজরদারি প্রয়োজন।”