
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় বড় একটা ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপেও। বিশ্বে সার ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণের দাম হুহু করে বাড়ছে।
জ্বালানি ও সার আমদানির খরচ প্রতিনিয়ত যেভাবে বাড়ছে, তাতে কৃষকের পরিস্থিতি হয়ে উঠছে আরও কঠিন।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষি যন্ত্রপাতি পরিচালনার খরচও সমানতালে বাড়ছে বলে জানান অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া ডেইরি ফার্মার্সের সভাপতি মার্ক বিলিং। তিনি বলেন, ‘প্রথম সমস্যা হলো জ্বালানি পাওয়া, দ্বিতীয় সমস্যা এর দাম। দুই সংকটই এখন প্রায় দ্বিগুণ। কনটেইনার ও জাহাজে আমাদের পণ্য তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, পণ্য পরিবহনের খরচ, বীমা খরচ—সবকিছুর কারণেই খরচ বাড়ছে। তাই, বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্যকে প্রতিযোগিতামূলক একটা জায়গায় রাখা এখন চ্যালেঞ্জ।’
সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিটাস মেরিটাইমের চিফ অপারেটিং অফিসার অলিভিয়া লেনক্স কিং এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সারের সরবরাহ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
গত মঙ্গলবার হংকংয়ের ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন বর্তমানে ড্রাই বাল্ক শিপিং শিল্পের প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সার।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈশ্বিক ইউরিয়া চাহিদার বেশিরভাগই মেটানো হয় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যা বর্তমানে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। লেনক্স কিং আরও উল্লেখ করেন, ইউরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক দেশ চীনও তাদের সার কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে ইউরিয়া সারের ঘাটতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। যদি এ পরিস্থিতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত গড়ায়, তবে সারের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন হ্রাস করবে।
বৈশ্বিক এ সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিনগুলোয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের দামে বেশি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো হুঁশিয়ারি দিচ্ছে যে, খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এ মহাদেশের অরক্ষিত দেশগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। মর্সি ক্রপসের আফ্রিকাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মেলাকু ইয়ারগা সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এ সংকটের সময়টি ইথিওপিয়া, সুদান ও সোমালিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। এসব দেশের লাখ লাখ মানুষ আগে থেকেই খরা, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি এবং অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের কবলে পড়ে ধুঁকছে। জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) মতে, সোমালিয়া ও সুদানে গত কয়েক বছরে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল; মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশ দুটি আবারও তীব্র অনাহারের মুখে পড়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।