
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা কাঠামোগত দুর্বলতার মুখোমুখি। উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি, তারল্য সংকট এবং কর্পোরেট সুশাসনের ঘাটতির কারণে এই খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যাংক পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণনীতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে টেকসইভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিদ্যমান আইন—যেমন ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার—সংকটাপন্ন ব্যাংককে দ্রুত পুনর্গঠন বা কার্যকরভাবে অবসায়নের জন্য যথেষ্ট সক্ষম নয়। ফলে সমস্যা দীর্ঘায়িত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার পূর্ববর্তী ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিল করে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত।
এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। অতীতে দুর্বল ব্যাংকগুলো বাঁচাতে দীর্ঘসূত্রিতা ও অকার্যকর পদক্ষেপের কারণে পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে ব্যাংক উদ্ধার করতে হয়েছে, যা নৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। নতুন আইনটি এই প্রবণতা থেকে সরে এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে—প্রথমে ক্ষতি বহন করবে শেয়ারহোল্ডার ও ঋণদাতারা; রাষ্ট্র হবে সর্বশেষ অবলম্বন।
আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন্দ্রীয় রেজল্যুশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে লক্ষ্য শুধু একটি ব্যাংক বন্ধ করা নয়, বরং তার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু রাখা, সম্পদের মূল্য সংরক্ষণ এবং বাজারে আস্থা বজায় রাখা। এই প্রক্রিয়ায় ‘কোনো ঋণদাতাকে অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত না করার নীতি’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, অর্থাৎ কোনো পাওনাদারকে এমন অবস্থায় ফেলা যাবে না, যা সরাসরি অবসায়নের চেয়েও খারাপ।
আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আধুনিক রেজল্যুশন টুলসের অন্তর্ভুক্তি। যেমন—‘বেইল-ইন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডার ও নির্দিষ্ট ঋণদাতাদের ওপর ক্ষতির বোঝা আরোপ করে ব্যাংককে সচল রাখা; ‘ব্রিজ ব্যাংক’ গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ সেবা অব্যাহত রাখা; এবং ‘সম্পদ ও দায় হস্তান্তর’ পদ্ধতির মাধ্যমে দ্রুত পুনর্গঠন নিশ্চিত করা। এসব পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত ও কার্যকর।
এছাড়া, দুর্বল ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন ও দায় ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংককে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে নতুন শেয়ার ইস্যু, শেয়ার কাঠামো পরিবর্তন এবং দায়কে ইক্যুইটিতে রূপান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে—যা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক।
আইনের আওতায় একটি ‘ব্যাংক পুনর্গঠন ও রেজল্যুশন তহবিল’ গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা সংকট মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা দেবে। এই তহবিল সরকার, ব্যাংকিং খাত এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার অবদানে গঠিত হতে পারে। তবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—সরকারি সহায়তা হবে সর্বশেষ বিকল্প। এতে করদাতাদের ওপর চাপ কমবে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
বিচারিক কাঠামোর দিক থেকেও আইনটি গুরুত্বপূর্ণ। রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় আদালতের হস্তক্ষেপ সীমিত রাখা হয়েছে, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। তবে এতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই দক্ষতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
আইনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো ১৮ক ধারা, যা ‘পুনরায় সুযোগ প্রদানের ব্যবস্থা’ হিসেবে বিবেচিত। এই ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে পূর্ববর্তী শেয়ারহোল্ডার বা বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত ব্যক্তি পুনরায় ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণ করতে পারে।
তবে এর জন্য কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে—সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদত্ত অর্থ ফেরত দেওয়া, নতুন মূলধন বিনিয়োগ, আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় পরিশোধ, কর পরিশোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। আবেদন অনুমোদনের আগে ৭.৫ শতাংশ অর্থ অগ্রিম এবং বাকি অর্থ দুই বছরের মধ্যে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক দুই বছর নিবিড় তদারকি করবে।
সরকার এই ধারার পক্ষে কয়েকটি যুক্তি দিয়েছে।
প্রথমত, ব্যাংকের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা;
দ্বিতীয়ত, বাজারভিত্তিক সমাধান উৎসাহিত করা;
এবং তৃতীয়ত, সম্পদের মূল্য সংরক্ষণ।
তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো—পূর্ববর্তী শেয়ারহোল্ডারদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণে আসার সুযোগ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক ব্যাংকের দুরবস্থার জন্য পরিচালনা পর্ষদ বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী দায়ী। ফলে প্রশ্ন উঠছে—তাদের আবার সুযোগ দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?
সমালোচকদের মতে, এটি নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ ব্যর্থতার পরও পুনরায় সুযোগ থাকলে অনৈতিক বা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
এছাড়া স্বার্থের দ্বন্দ্বের আশঙ্কাও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে রেজল্যুশন কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে পুনঃধারণ অনুমোদনকারী। ফলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকিও এখানে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অর্থনৈতিক ঝুঁকির দিক থেকেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আবেদনকারীরা অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, যা বাস্তবায়নযোগ্য নাও হতে পারে। পুরোনো ব্যবস্থাপনা ফিরে এলে অনিয়ম পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও থাকে। এতে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে এই ধারা কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। যোগ্য ও সৎ পূর্ববর্তী শেয়ারহোল্ডারদের মাধ্যমে দ্রুত পুনর্গঠন সম্ভব হতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে এবং সরকারি অর্থ ছাড়াই ব্যাংক পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে এই ধরনের সুযোগ সীমিত। অনেক দেশে পূর্ববর্তী মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণে আসার ক্ষেত্রে কঠোর ‘যোগ্যতা ও উপযুক্ততা যাচাই’ করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য মূল শিক্ষা হলো—এই সুযোগ থাকলেও তা কঠোর শর্ত, স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন যাচাইয়ের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। প্রয়োজনে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন, অনিয়মকারীদের বাদ দেওয়া এবং পুরো প্রক্রিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি মাইলফলক। এটি শুধু একটি আইন নয়, বরং একটি সমন্বিত আর্থিক নিরাপত্তা কাঠামো। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এই আইন দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হবে।
মো. খায়রুল হাসান : ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের হেড অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনস