১১ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার
২৮শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অচেনা জায়গায় রাতে ঘুম আসে না? কারণ জানলে চমকে যাবেন

শেয়ার করুন

ভ্রমণে গেছেন, কিংবা নতুন কোনো বাসা; সবকিছু ঠিকঠাক, কিন্তু রাত নামতেই শুরু হয় অদ্ভুত এক অস্বস্তি। বিছানায় শুয়ে আছেন, অথচ ঘুম আসছে না। সামান্য শব্দেই চমকে উঠে বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। অনেকেই ভাবেন, এটা হয়তো ক্লান্তি, মানসিক চাপ বা অচেনা পরিবেশের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর এবং চমকপ্রদ একটি কারণ, যার নাম ‘ফার্স্ট নাইট এফেক্ট’। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই রহস্যের জট খুলেছেন অস্ট্রিয়ার সলজবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, অচেনা পরিবেশে ঘুমানোর সময় আমাদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিশ্রামে যায় না। বরং এর কিছু অংশ তখনও সজাগ অবস্থায় থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘুমন্ত অবস্থায় মস্তিষ্কের কিছু অনুভূতি জেগে থাকা সময়ের চেয়েও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই অতিরিক্ত সজাগতা আমাদের চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে বাড়তি সচেতন করে তোলে, ফলে সহজে গভীর ঘুমে ডুবে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই গবেষণায় ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি’ বা ইইজি (EEG) মেশিন ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, অচেনা জায়গায় ঘুমালে মস্তিষ্ক আশেপাশের সামান্য শব্দ বা নড়াচড়াকেও সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে গভীর ঘুমের পরিবর্তে শরীর থাকে একধরনের হালকা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়; যেখানে যেকোনো মুহূর্তে জেগে ওঠার প্রস্তুতি থাকে।

গবেষণার অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে একটি আকর্ষণীয় পরীক্ষা চালানো হয়। প্রথম রাতে তাদের সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে দেওয়া হয়। দেখা যায়, নতুন জায়গার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে তাদের মস্তিষ্ক বেশ সংগ্রাম করছে এবং ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় রাতে পরীক্ষার ধরনে আনা হয় ভিন্নতা। ঘুমের মধ্যে খুব মৃদু স্বরে তাদের পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর শোনানো হয়; যেমন পরিবারের সদস্যদের গলা। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। অচেনা জায়গাতেও এই পরিচিত শব্দ শোনার পর তাদের ঘুম আগের তুলনায় অনেক বেশি গভীর ও স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক তখন নিজেকে নিরাপদ মনে করতে শুরু করে।

অন্যদিকে তৃতীয় রাতে গবেষকরা উল্টো পরীক্ষা চালান। ঘুমের মধ্যে অপরিচিত মানুষের কণ্ঠে অংশগ্রহণকারীদের নাম ধরে ডাকা হয় বা অদ্ভুত শব্দ করা হয়। দেখা যায়, শব্দের তীব্রতা কম হলেও অপরিচিত হওয়ার কারণে সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঘুম হালকা হয়ে যায়। মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ সজাগ হয়ে ওঠে এবং আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি মানুষের আদিম প্রবৃত্তির অংশ। প্রাচীনকালে বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষ ঘুমের মধ্যেও আংশিক সজাগ থাকার এই কৌশল গড়ে তুলেছিল। সেই বিবর্তিত বৈশিষ্ট্যই আজও আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কে রয়ে গেছে। তাই অচেনা জায়গায় গেলে এটি আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

সুতরাং, নতুন জায়গায় ঘুম না হওয়া কোনো অসুখ নয়; বরং এটি আপনার মস্তিষ্কের বাড়তি সতর্কতারই প্রকাশ। তবে এই সমস্যা কিছুটা কমাতে আপনি সহজ কিছু কৌশল অনুসরণ করতে পারেন। যেমন- নিজের পরিচিত বালিশ সঙ্গে রাখা, প্রিয় সুগন্ধি ব্যবহার করা বা হালকা পরিচিত শব্দ (যেমন সাদা শব্দ বা পরিচিত সংগীত) শোনা। এতে মস্তিষ্ক দ্রুত সেই পরিবেশকে নিরাপদ হিসেবে গ্রহণ করে এবং আপনাকে সহজেই গভীর ঘুমে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।

সূত্র : টিভি নাইন বাংলা

শেয়ার করুন