
বিশ্বরাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য চিরকালই এক উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি কিন্তু সাম্প্রতিককালে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান এ অঞ্চলকে যে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে, তা গত কয়েক দশকের ইতিহাসে নজিরবিহীন। গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযান এবং সামরিক স্থাপনাগুলোতে অবিরাম বোমাবর্ষণ একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এখন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, কারণ এ সংঘাতের কোনো সুস্পষ্ট পরিণতি কারও জানা নেই। একটি যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন বিবদমান দুপক্ষেরই নিজস্ব কিছু যুক্তি ও অবস্থান থাকে। কিন্তু দিনশেষে ভূরাজনৈতিক এ দাবা খেলায় সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে দাঁড়ায় ধ্বংসযজ্ঞ, প্রাণহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক বিপর্যয়।
যুদ্ধরত পক্ষগুলোর যুক্তি যা-ই হোক না কেন, এ সংঘাতের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটি হলো এর সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞ। আধুনিক সমরবিদ্যায় ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বা সুনির্দিষ্ট হামলার কথা বলা হলেও বাস্তবচিত্র এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন কার্যত এক অস্থিরতা বিরাজ করছে। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি নির্বিচারে বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছে। প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ছে অগুনতি মানুষের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।
তবে এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড়, দৃশ্যমান বৈশ্বিক ধাক্কাটি লেগেছে জ্বালানি খাতে। মধ্যপ্রাচ্য হলো বিশ্বের জ্বালানি তেলের অন্যতম বড় মজুদ। কিন্তু এ সর্বাত্মক যুদ্ধে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান নৌপথ এবং কৌশলগত রুটগুলো কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তেলের খনি, শোধনাগার এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপত্তার অভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। যে জ্বালানি তেলের ওপর ভর করে আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতির চাকা ঘোরে, সেই সরবরাহের চেইন আজ সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। জ্বালানির এ সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে এক পঙ্গু দশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পরাশক্তিগুলোর এ ক্ষমতার লড়াই ও সামরিক আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক অন্তহীন খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে, যার কোনো তল নেই। যুদ্ধ শুধু ভৌগোলিক সীমারেখাই রক্তাক্ত করছে না, জ্বালানি সংকট আর অর্থনৈতিক ধসের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করছে। এ যুদ্ধের অদৃশ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতির বোঝা এবং স্থিতিশীলতা হারানোর এ চরম মূল্য শুধু আজকের প্রজন্ম নয়, আগামী কয়েক প্রজন্ম ধরে বৃহত্তর বিশ্বের মানুষকে বইতে হবে।
এ সংঘাতের দাবানল আর শুধু ইরান ও ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সীমারেখায় আটকে নেই, এটি এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতেও এক ভয়ংকর মেরূকরণ এবং বিস্তারের জন্ম দিচ্ছে। উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার আন্তঃসীমান্তেও। ন্যাটোর (NATO) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রতি তুরস্কের আকাশসীমায় ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এ ছাড়া প্রতিবেশী আজারবাইজানের ভূখণ্ডেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। লেবানন ও সিরিয়া আগে থেকেই এ যুদ্ধের সরাসরি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে ইসরায়েলের অবিরাম বিমান হামলায় বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত। উদ্ভূত এ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে আমিরাত থেকে তাদের বহু নাগরিককে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নিয়েছে। উপরন্তু, ইরান ইউরোপীয় দেশগুলোকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে যে, তারা যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে এ আগ্রাসনে সহায়তা করে, তবে ইউরোপও তাদের প্রতিশোধের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। পরাশক্তিগুলোর এ রেষারেষির সুযোগে বিশ্বের অন্যান্য খেলোয়াড় নীরবে নিজেদের হিসাব কষছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক শক্তি, অর্থ ও মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন রাশিয়া অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। ওয়াশিংটনের নজর ও সামরিক রসদ মধ্যপ্রাচ্যে ঘুরে যাওয়ায় ইউক্রেন ফ্রন্টে মস্কো এক অভাবনীয় কৌশলগত সুবিধা পেয়ে গেছে। অন্যদিকে, নীরব দর্শক হয়ে বসে নেই চীনও। বেইজিং এখন সূক্ষ্মভাবে হিসাব কষছে যে, যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে কতগুলো ফ্রন্টে লড়াই করার বা মিত্রদের সামরিক সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এ সামরিক মনোযোগের বিভাজন এ বহুমুখী মেরূকরণ এবং একের পর এক দেশের এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া অতীতের স্নায়ুযুদ্ধের চেয়েও এক ভয়ংকর বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিচ্ছে, যা যে কোনো মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে খাদের একদম শেষ প্রান্তে ঠেলে দিতে পারে।
ইতিহাসের অমোঘ সত্য হলো, যুদ্ধ কখনো শান্তি আনতে পারে না, এটি শুধু নতুন ধ্বংসযজ্ঞ ও দীর্ঘস্থায়ী ঘৃণার বীজ বপন করে। পরাশক্তিগুলোর এ পেশিশক্তি প্রদর্শন এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের নগ্ন দ্বন্দ্বে সবচেয়ে চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, হোক তা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো শহরে, কিংবা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন আর শুধু নীরব দর্শক থাকার সুযোগ নেই। পুরো বিশ্বকে খাদের কিনারা থেকে ফেরাতে অবিলম্বে এ ধ্বংসযজ্ঞের লাগাম টেনে ধরে একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এখন শুধু দূর থেকে আক্ষেপ করার সময় নেই। আসন্ন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভূকম্পন সামলাতে আমাদের এখনই নিজেদের ঘর গোছাতে হবে। জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস সন্ধান এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত লাখো প্রবাসীর সুরক্ষায় একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কৌশল নির্ধারণ এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিশ্বনেতাদের এ মরণখেলার অদৃশ্য মাশুল যেন আমাদের দেশের সাধারণ ও খেটেখাওয়া মানুষকে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়ে মেটাতে না হয়, সে বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি অবলম্বনের সময় এখনই।
হৃদয় পান্ডে, শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ