
রংপুরের কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিতে নীরব কিন্তু টেকসই এক পরিবর্তন এনে দিচ্ছে নার্সারি ব্যবসা। গত কয়েক বছরে এই খাতের বিস্তারে একদিকে যেমন শতাধিক উদ্যোক্তা স্বাবলম্বী হয়েছেন, অন্যদিকে হাজারো বেকার মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে স্থায়ী ও মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ। ফলে গ্রামভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি এসেছে এবং জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় বর্তমানে কয়েকশ নার্সারি সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত উভয় ধরনের নার্সারিতেই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কৃষিশ্রমিক কাজ করছেন। এসব শ্রমিক দৈনিক মজুরি পেয়ে নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি পরিবারে স্বচ্ছলতা আনছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় জানায়, ফলজ, বনজ, ফুল ও ঔষধি গাছের চারা উৎপাদনের চাহিদা বাড়ায় নার্সারি ব্যবসা দিন দিন আরও লাভজনক হয়ে উঠছে। এই চাহিদাই নতুন উদ্যোক্তাদের এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও সবুজায়নেও নার্সারিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শুধু নার্সারি মালিকরাই নন, চারা পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ভ্যানচালক ও ফেরিওয়ালারাও এই খাত থেকে নিয়মিত আয় করছেন। অনেকেই নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করে গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। এভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ নার্সারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার এক উদ্যোক্তা জানান, দারিদ্র্যের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর নার্সারি ব্যবসাই তার জীবনে স্থিতি এনেছে। কয়েক বছর আগে ছোট পরিসরে শুরু করলেও এখন তার নার্সারিতে নানা জাতের হাজার হাজার চারা রয়েছে, যা বিক্রি করে তিনি নিয়মিত আয় করছেন এবং কয়েকজন শ্রমিকের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছেন।
একইভাবে তারাগঞ্জ ও পীরগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তা জানান, নার্সারি ব্যবসাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ফলে তাদের আর বেকারত্বের চিন্তা করতে হচ্ছে না। দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির গাছের চারা উৎপাদন করে তারা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আশপাশের জেলাতেও সরবরাহ করছেন।
রংপুর সদর উপজেলার একজন অভিজ্ঞ নার্সারি মালিক বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি এখন বড় পরিসরে নার্সারি পরিচালনা করছেন। তার নার্সারিতে শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন, যারা মাসিক বেতন পেয়ে স্বচ্ছল জীবনযাপন করছেন। বৃক্ষরোপণের মৌসুমে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক চারা বিক্রি হয় বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নার্সারি শিল্প শুধু আয় ও কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পথও সুগম করছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে এই খাত আরও বিস্তৃত হবে এবং ভবিষ্যতে রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে।
লিখেছেন, শাকিল রহমান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর