
বিলবোর্ড, টেলিভিশন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিজ্ঞাপনের সর্বব্যাপী উপস্থিতি আজ ভোক্তার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রশ্ন উঠছে, এসব বিজ্ঞাপন কি কেবল পণ্যের তথ্য দেয়, নাকি নীরবে ভোক্তার পছন্দ ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে দেয়।
শহরের ব্যস্ত সড়কে চোখে পড়ে বিশাল বিলবোর্ড, বাসার ভেতরে টেলিভিশনের পর্দায় ঘুরে ফিরে আসে বিজ্ঞাপন। আর মোবাইল ফোন খুললেই ভেসে ওঠে পপ-আপ বিজ্ঞাপন। আধুনিক নগরজীবনে একজন মানুষ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গড়ে শতাধিক বিজ্ঞাপনের মুখোমুখি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিজ্ঞাপনগুলো আর শুধু পণ্যের পরিচিতি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এগুলো ভোক্তার মানসিকতা, রুচি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন বদলে দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আবেগ। একটি শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপনে মায়ের স্নেহ, একটি স্বাস্থ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনে নিরাপত্তার আশ্বাস কিংবা একটি মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনে স্বাধীনতার অনুভূতি, এসব আবেগী উপস্থাপন ভোক্তার মনে গভীর ছাপ ফেলে। বিজ্ঞাপন নির্মাতারা জানান, যুক্তির চেয়ে আবেগ মানুষের সিদ্ধান্তে বেশি প্রভাব ফেলে। ফলে ভোক্তা অনেক সময় পণ্যের প্রয়োজনীয়তা বা গুণগত মান যাচাই না করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে একটি পণ্যের চারপাশে গড়ে ওঠে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ইমেজ। কোনো ব্র্যান্ড বিলাসবহুল, কোনোটি নির্ভরযোগ্য আবার কোনোটি আধুনিক জীবনধারার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে একই বার্তা ও চিত্রের পুনরাবৃত্তির ফলে একটি ব্র্যান্ড ভোক্তার মনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে। তাই দোকানে গিয়ে একই ধরনের একাধিক পণ্য দেখলেও ভোক্তার হাত স্বাভাবিকভাবেই চলে যায় পরিচিত ব্র্যান্ডটির দিকে।
এই প্রক্রিয়ায় সেলিব্রিটি এন্ডোর্সমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জনপ্রিয় অভিনেতা, খেলোয়াড় বা অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারের ব্যবহৃত পণ্য ভোক্তার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচিত মুখের উপস্থিতি পণ্যের মান যাচাইয়ের চেয়ে বিশ্বাস তৈরিতে বেশি কাজ করে। ফলে ভোক্তা অনেক সময় অজান্তেই বিজ্ঞাপনের প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
ডিজিটাল যুগে বিজ্ঞাপনের প্রভাব আরও সূক্ষ্ম ও গভীর হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর সার্চ হিস্ট্রি, পছন্দ ও আচরণ বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন দেখায়। এতে ভোক্তার সামনে বারবার একই পণ্যের বিজ্ঞাপন আসতে থাকে। এক পর্যায়ে সেই পণ্যটি ভোক্তার কাছে প্রয়োজনীয় বলে মনে হতে শুরু করে।
এ ধরনের টার্গেটেড বিজ্ঞাপন ভোক্তার অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে। ভোক্তা বুঝতেই পারেন না কখন তার পছন্দ তৈরি হচ্ছে বা পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রক্রিয়া ভোক্তার কেনাকাটার অভ্যাস ও জীবনধারায় পরিবর্তন আনে। তবে বিজ্ঞাপনের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এটি ভোক্তাকে নতুন পণ্য সম্পর্কে জানায়, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করে। কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরতা ভোক্তাকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বন্ধু বান্ধব এর সাথে আলোচনায় বসলেই তারা একেকজনের অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করে। কেউ কেউ আশংকাও প্রকাশ করে যে আমরা কি তাহলে আমাদের পছন্দের পণ্যগুলো অজান্তেই কোম্পানির বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর করেই কিনে থাকি। আমরা কি তাহলে ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতাটাও হারিয়ে ফেলছি কোম্পানির বিজ্ঞাপনগুলোর দ্বারা। নানা প্রশ্নের উত্তরে আসে আমাদের সচেতনতা। আমরা সচেতন হলেই কেবল কোম্পানির বিজ্ঞাপন বা সেলিব্রিটির ব্যবহার করা পণ্য হাতে তুলে নিবো না বরং গুণগত মান বিবেচনা করতে পারবো।
বিজ্ঞাপন আধুনিক অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ হলেও, ভোক্তার দায়িত্ব হলো বিজ্ঞাপনের বার্তা বিশ্লেষণ করে দেখা। পণ্যের প্রকৃত প্রয়োজন, মান ও মূল্য বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ সচেতন ভোক্তাই পারে বিজ্ঞাপনের প্রভাবের বাইরে গিয়ে নিজের স্বাধীন পছন্দ বজায় রাখতে।
আশিকুর রহমান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।