২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার
১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুদান: আফ্রিকায় ইসলামের প্রথম আশ্রয় ও বিস্তারের সূতিকাগার

শেয়ার করুন


আফ্রিকা মহাদেশে ইসলামের ইতিহাসের সূচনালগ্নে সুদান ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এক অনন্য মর্যাদা লাভ করে। এই ভূখণ্ডই আফ্রিকায় ইসলামের প্রথম আশ্রয় ও পরবর্তী বিস্তারের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।মক্কায় নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে মহানবী মুহাম্মদ (স.)-এর নির্দেশে ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে একদল সাহাবি লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আকসাম অঞ্চলে হিজরত করেন। এই আকসাম অঞ্চল বর্তমান ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া ও সুদান-সংলগ্ন এলাকা নিয়ে গঠিত। ইসলামের ইতিহাসে এটিই প্রথম হিজরত। প্রথম দলে ২৩ জন এবং পরবর্তীতে আরও ১০১ জন মুসলমান এখানে আশ্রয় নেন। ন্যায়পরায়ণ শাসক নাজ্জাশি তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।এই হিজরতের ধারাবাহিকতায় লোহিত সাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে ইসলামের স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে ওঠে। ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে ইরিত্রিয়ার মাসাওয়া অঞ্চলে নির্মিত ‘দুই কিবলার মসজিদ’ আফ্রিকার অন্যতম প্রাচীন মসজিদ হিসেবে পরিচিত, যা ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।মুসলিম বণিক ও দাঈরা লোহিত সাগরের উপকূল ধরে ব্যবসা, নৈতিকতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করেন। এই মানবিক দাওয়াতই সুদানসহ আশপাশের অঞ্চলে ইসলামের শিকড় দৃঢ় করে।৬৪১ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে মিসর বিজয়ের পর নীলনদের উপত্যকা ধরে ইসলামের প্রভাব সুদানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পরবর্তী শতাব্দীতে আরব বণিক, আলেম ও সুফি সাধকদের মাধ্যমে ইসলাম সুদানের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়।ইসলামের সঙ্গে সঙ্গে আরবি ভাষা ও লিপির প্রসার ঘটে। কোরআনের ভাষা হিসেবে আরবি শিক্ষা সাক্ষরতা বৃদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার পথ সুগম করে। ফলে ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থার এক শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হয়।আজ সুদানের অধিকাংশ মুসলমান সুন্নি ও মালিকি মাজহাব অনুসারী। সুফি তরিকাগুলোর প্রভাব সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে গভীর। রাজনীতিতেও ইসলামের উপস্থিতি স্পষ্ট—মাহদি আন্দোলন, সুফি গোষ্ঠী ও বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব রেখে চলেছে।সুদানকে কেন্দ্র করে ইসলামের আলো উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে সাহেল অঞ্চলসহ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। কাইরুয়ান, টিমবুকটু ও জেনের মতো নগরী পরিণত হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে।


সুদান আফ্রিকায় ইসলামের প্রথম আশ্রয়স্থল ও বিস্তারের প্রবেশদ্বার। মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যে বীজ এখানে রোপিত হয়েছিল, তা-ই আজ আফ্রিকার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে ইসলামের সুগভীর ও স্থায়ী প্রভাবের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

সিএনআই/২৫

শেয়ার করুন